হোম > সারা দেশ > ঢাকা

ইয়াবার তথ্য ফাঁসের আশঙ্কায় রাহুলকে হত্যা, দুই বছর পর রহস্য উদ্ঘাটন

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎

নিহত রাহুল। ছবি: সংগৃহীত

রাতের খাবার খেয়ে অটোরিকশা রাখার ওয়ার্কশপে ঘুমাতে গিয়েছিলেন ১৯ বছরের রাহুল। পরদিন আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। বন্ধ পাওয়া যায় তাঁর মুঠোফোন। নিখোঁজ ছিল অটোরিকশাটিও। দুই দিন পর ওয়ার্কশপের পাশে ভুট্টাখেতের আইলের ঝোপ থেকে উদ্ধার করা হয় রাহুলের অর্ধগলিত লাশ। ঢাকার নবাবগঞ্জের এই ঘটনার দুই বছরের বেশি সময় পর ওই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. সমেজ (৩২), মো. সবুজ মিয়া (২৮), খবির ওরফে গোবিন্দ (২৮), মো. হাবিব ওরফে সজল (৩৬) ও মো. লালন মোল্লা (৪৩)। তাঁদের মধ্যে সবুজ মিয়া ও লালন মোল্লা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআইয়ের ভাষ্য, নিহত রাহুল ও আসামিরা পূর্বপরিচিত ছিলেন। ইয়াবা কেনাবেচা ও সেবনের সূত্রে তাঁদের মধ্যে পরিচয় হয়। লালন মোল্লার ইয়াবা বিক্রির তথ্য রাহুল বিভিন্ন জায়গায় ফাঁস করে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁর অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নিয়ে বিক্রি করার পরিকল্পনাও ছিল।

তদন্ত ও গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী রাহুলকে অটোরিকশাসহ নবাবগঞ্জের তমসেল মাদবরের খোলা মাঠে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন লালন, সজল, সমেজ ও গোবিন্দ। তাঁরা প্রথমে রাহুলকে ইয়াবা সেবন করান। পরে লালন লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাঁর মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে রাহুল গুরুতর আহত হন।

এরপর রাহুলের কান ও মুখে ব্লেড দিয়ে আঘাত করা হয়। তাঁর অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়েও মুখে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে শ্বাসরোধ করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন আসামিরা।

পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর উত্তরায় এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর লাশ অটোরিকশায় বসিয়ে সজলের গরুর খামারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দিন মরদেহটি রাখা হয়। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার পর রাহুলের মরদেহ ওমর ফারুকের অটোরিকশা রাখার ওয়ার্কশপের পাশে ফেলে রাখা হয়।

এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে ঢাকার নবাবগঞ্জের চক সিংহড়া এলাকার বাসা থেকে রাতের খাবার খেয়ে ওয়ার্কশপে ঘুমাতে যান রাহুল। তিনি ভাড়ায় অটোরিকশা চালাতেন এবং স্থানীয় ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপে অটোরিকশাটি রাখতেন। রাতে সেখানেই ঘুমাতেন তিনি।

পরদিন বাড়িতে না ফেরায় রাহুলের বাবা আবদুর রহমান ওয়ার্কশপে গিয়ে খোঁজ করেন। সেখানে ছেলেকে না পেয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করেন। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার দিকে ওয়ার্কশপের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ভুট্টাখেতের জমির আইলের ঝোপ থেকে রাহুলের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় ওই দিন রাহুলের বাবা আবদুর রহমান বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআইয়ের এসআই মো. আব্দুর রহিম।

তদন্তের ধারাবাহিকতায় গত মার্চে নবাবগঞ্জের পাতিলঝাপ এলাকা থেকে প্রথমে সমেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় সবুজ মিয়াকে। সবুজ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

পরে সবুজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে খবির ওরফে গোবিন্দ, হাবিব ওরফে সজল এবং লালন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে লালনও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআইয়ের ভাষ্য, লালন মোল্লা ইয়াবার কারবারে জড়িত ছিলেন। রাহুলসহ অন্য আসামিরা তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন এবং একসঙ্গে সেবন করতেন। একপর্যায়ে লালন জানতে পারেন, তাঁর ইয়াবা বিক্রির তথ্য রাহুল বিভিন্ন জায়গায় জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। এরপরই তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ জানান, হত্যার পর রাহুলের অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তদন্ত এখনো চলছে।