রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার (রাড্ডা ক্লিনিক) লুটপাট ও গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলচেষ্টার ঘটনায় নাম আসা বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) পদ ছাড়তে হলো। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩-এর এমপি ছিলেন। গতকালই তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে রাজনৈতিক কারণে এবং দল থেকে বহিষ্কারের পর বিভিন্ন সময় কয়েকজন এমপি পদত্যাগ করলেও হামলা, লুটপাট ও দখলচেষ্টার অভিযোগ ওঠার পর দলীয় প্রধানের নির্দেশে এমপি পদ থেকে কারও পদত্যাগের ঘটনা এটিই প্রথম।
বিএনপির সূত্র বলেছে, রাড্ডা ক্লিনিকসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দলীয় পদক্ষেপের বাইরেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংরক্ষিত আসনের এমপি পদ থেকে পদত্যাগ করা মিষ্টির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এ ছাড়া গত বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। একই দিন ঢাকা মহানগর উত্তর জাতীয়তাবাদী যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিচ্ছে মিরপুর ১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। পাকা ভবনের আলট্রাসাউন্ড কক্ষ, টিকা কক্ষ, ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের জানালা-দরজা ভেঙে লুটপাট চালায়। এরপর সেখানে ‘ওই প্লটের মালিক সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। মামলায় নাম থাকা স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতা এলাকায় মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে সেখানে আবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
২০০৬ সালে স্থানীয় ওয়ার্ডের কাউন্সিলর থাকাকালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির’ সভাপতি ছিলেন মিষ্টি। রাড্ডা সেন্টারের জমিটি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ দিতে তখন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে করা আবেদনেও সভাপতি হিসেবে মিষ্টির সই ছিল।
মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। তাঁর স্বামী প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মিষ্টি ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
রাড্ডা সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলের চেষ্টার ঘটনায় মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে বুধবার রাতে সংসদ সদস্য পদ থেকে মিষ্টিকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বেলা পৌনে ২টার দিকে সংসদে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। মিনিট পাঁচেক স্পিকারের দপ্তরে অবস্থান করেন তিনি। সংসদ থেকে চলে যাওয়ার সময় পদত্যাগ করছেন কি না, এমন প্রশ্নে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তদন্ত হোক। বিএনপির সিদ্ধান্ত যেটা হবে, তা হবে।
সূত্র জানায়, পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও সেটি দখলচেষ্টার সঙ্গে মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন।
সংসদ সচিবালয় সূত্র বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর দাপ্তরিক কাজ এগিয়ে রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আগেই নির্দেশনা দেয় সংসদ সচিবালয়। স্পিকারের কাছে মিষ্টি পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে বাকি প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ব্রিফিং করে মিষ্টির পদত্যাগের কথা জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সচিবালয়ে গতকাল সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অভিযোগের তদন্তে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর (মিষ্টি) বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি দলীয়ভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। এসব তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সঠিক হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সরকারের সময়ে কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না। সরকার সব ধরনের অপরাধ দমনের চেষ্টা করছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে সবার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। অপরাধ ঘটে গেলে সেখানে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং হবে।
মিষ্টির শূন্য হওয়া সংরক্ষিত আসনে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। নির্বাচন ভবনে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন দিয়ে আসনটি পূরণ করা হবে। এ শূন্য আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। একটি আসনের বিপরীতে একাধিক প্রার্থী থাকলে তখন ভোট হবে; একক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। যে দল বা জোটের জন্য আসনটি বরাদ্দ, সেই দল বা জোটই শূন্য আসনটি পাবে।
ত্রয়োদশ সংসদে বিএনপি ৩৬টি সংরক্ষিত আসন পায়। মিষ্টির পদত্যাগের পর একটি আসন শূন্য হলো। জামায়াত জোট থেকে ১৩টি এবং স্বতন্ত্র জোট থেকে একজন সংরক্ষিত আসনের এমপি রয়েছেন।
দলীয় প্রধানের নির্দেশের পর এমপি পদ থেকে মিষ্টি পদত্যাগ করায় কোনো আইটি জটিলতা নেই বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দল যদি তাঁকে মনোনয়ন না দিত, তিনি এমপি হতে পারতেন না। দলের প্রধান হিসেবে দলের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে যদি কাউকে মনে করেন এবং সংশ্লিষ্ট এমপি যদি সেটা মানেন, তো এর মধ্যে তো কোনো দোষের কিছু নেই।
সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, হামলা, লুটপাট ও দখলচেষ্টার ঘটনায় নাম আসায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কোনো এমপির পদত্যাগের নজির এটিই প্রথম। এর আগে বিভিন্ন সংসদে দল থেকে বহিষ্কার বা রাজনৈতিক কারণে সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের নজির রয়েছে।
এর আগে বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তে একাদশ সংসদ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে দলীয় সাতজন এমপি পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১৪ সালের দশম সংসদের এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) থেকে বহিষ্কার করা হয়। পরে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণা করতে স্পিকারকে চিঠি দেয় দলটি। এ নিয়ে ইসি শুনানির আয়োজন করলে সেখানে না গিয়ে ২০১৫ সালের ৩ অক্টোবর পদত্যাগ করেন লতিফ সিদ্দিকী। দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে প্রথমে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন নবম সংসদের এমপি ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। ২০১২ সালের ২৩ এপ্রিল তিনি এমপি পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে তা গ্রহণ করেননি স্পিকার। ২০১২ সালের ৭ জুলাই সোহেল তাজ আবারও পদত্যাগপত্র দিলে স্পিকার তা গ্রহণ করেন।
২০০৪ সালে বিএনপি সরকারের কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করে পদত্যাগ করে বিকল্প ধারায় যোগ দেন দলটির এমপি আবদুল মান্নান এবং মাহী বি চৌধুরী। পঞ্চম সংসদ থেকে বিরোধী দলের ১৪৭ এমপি গণপদত্যাগ করলেও স্পিকার তা গ্রহণ করেননি। টানা ৯০ কার্যদিবস সংসদে অনুপস্থিত থাকায় তাঁদের আসন শূন্য হয়। পঞ্চম সংসদে রাজনৈতিক কারণে পদত্যাগ করেন এইচ এম এরশাদ, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও দবিরুল ইসলাম। সপ্তম সংসদে আবদুল কাদের সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করেছিল। পরে নিজে দল গঠনের জন্য পদত্যাগ করেন। বাকশাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রতিবাদে ১৯৭৫ সালে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এ ছাড়া মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য পদত্যাগ করেছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস ও তালুকদার আবদুল খালেক।