• ২০১৭ সাল থেকে বন্ধ ছিল ওসমানী উদ্যান।
• গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নবরূপে উদ্যানটির উদ্বোধন করেন।
• উদ্যানের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হাঁটার পথের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।
• স্থপতিদের মতে, উদ্যানের বড় একটা অংশ কংক্রিট, মূল উপাদান মাটি ও সবুজ কমেছে।
দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে চলা ‘আধুনিকায়ন’ শেষে জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে রাজধানীর অবশিষ্ট গুটিকয়েক উন্মুক্ত স্থানের একটি ওসমানী উদ্যান। গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নবরূপের উদ্যানটির উদ্বোধন করেন। উদ্যানের আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর পার্কটি খুলে দেওয়ার খবর স্বস্তি এনেছে নগরবাসীর মনে। তবে উদ্বোধনের দিন সরেজমিনে দেখা গেছে, নতুন গাছ লাগানো ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মধ্য দিয়ে উদ্যানটিকে নতুন রূপ দেওয়া হলেও হাঁটার পথের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। স্থপতিদের মতে, বড় একটা অংশ কংক্রিটে ভরে যাওয়ায় উদ্যানের মূল উপাদান মাটি ও সবুজ ঘাসের আস্তরণও বেশ কমে গেছে।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যানজুড়ে নতুন করে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ, জলাশয়, বসার জায়গা, ব্যায়ামাগারসহ নাগরিকদের বিনোদন, অবসর কাটানো ও শরীরচর্চার নানা অবকাঠামো।
প্রায় ২২ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যান নগরবাসীর অনেকের হাঁটা, বিশ্রাম ও অবসর কাটানোর জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু উন্নয়নকাজের কারণে ২০১৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর বন্ধ ছিল। ২০১৭ সালে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ১০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এ উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন তিনি, যা ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
বিভিন্ন অভিযোগে প্রথম প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল হলে ২০২৩ সালে পিএফ করপোরেশনকে কাজ দেওয়া হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সীমানাপ্রাচীর, নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, ১২টি দোকান, জিমনেশিয়াম, শৌচাগার, গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, ৩ কিলোমিটার হাঁটার পথ নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, উদ্যানের একপাশে দুই স্তরের স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। নিচের স্তরে রয়েছে নগর জাদুঘর, গ্রন্থাগার, দোকান, জিমনেশিয়াম। ওপরে বসা ও হাঁটার স্থান রাখা হয়েছে। উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে আম, জামরুল, কদবেল, তেঁতুল, গাব, মেহগনি, অর্জুন, স্বর্ণচাপা, সোনালু ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির ফল, ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগানো হয়েছে। লাগানো হয়েছে দুর্বা ঘাসও। উদ্যানের দুই পাশে দুটি লেক তৈরি করা হয়েছে। একটি লেকে শ্যাওলাযুক্ত পানি থাকলেও আরেকটি সম্পূর্ণ শুকনো ছিল।
উদ্যানের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হাঁটার পথের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। শুধু সিমেন্টের ঢালাই দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাস্তার কাজ আগের ঠিকাদারেরা করেছে। কাজের মানের কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছিল। পরের ঠিকাদারেরা আর রাস্তার কাজ করেনি।’
উদ্যানের আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। ড. মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ৩৯ কোটি টাকায় এই স্মৃতিস্তম্ভ ও উদ্যানের দুটি প্রবেশফটক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ৮৩৪ জনের নাম খোদাই করা হয়েছে। সামনে রাখা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক। এই স্মৃতিস্তম্ভে বেশ কিছু রিলিফ ভাস্কর্যে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
ওসমানী উদ্যানের উন্নয়নকাজ নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কাজ বেশি করতে গিয়ে পার্কের চরিত্র নষ্ট করা হয়েছে। শুধু বাজেট বাড়াতেই এত কংক্রিটের কাজ করা হয়েছে। ৩০-৪০ শতাংশ জায়গা ভরে গেছে কংক্রিটে।’ নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বেশ কয়েক বছর ধরে একসময়ের সবুজ নিরিবিলি পার্কটির ভেতরে অতিরিক্ত কৃত্রিম স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, উন্নয়নকাজে ইমারত বিধিমালার বিধান অনুসরণ করা হয়নি। পার্কের আয়তনের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ রয়েছে।