বিটোপিয়াকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে হিসাব পরিচালনা, ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার, কাজের আদেশ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দোষী সাব্যস্ত না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনের বেসিস মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। ‘বিটোপিয়াকে ঘিরে প্রতারণার অভিযোগ এবং বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বেসিসের লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সংগঠনটির সহায়ক কমিটির সদস্য ও ট্রাস্ট-আইটি (বিডি) লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জুয়েল।
লিখিত বক্তব্যে বেসিস জানায়, বিটোপিয়া ও এর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর বিভিন্ন অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে হিসাব পরিচালনা, ব্যক্তিগত পরিচয় বা তথ্য ব্যবহার, কাজের আদেশ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থাপনা, কর্মী ও স্বাধীন পেশাজীবীদের হিসাব নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারের নীতিমালা লঙ্ঘন।
বেসিসের ভাষ্য, যথাযথ তদন্ত ছাড়া এসব অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। অভিযোগের ধরন ও সম্ভাব্য প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি উপেক্ষার সুযোগ নেই বলেও মনে করে সংগঠনটি।
বাংলাদেশের স্বাধীন পেশাজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে দেশের ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করেছেন বলে উল্লেখ করেছে বেসিস। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে পুরো স্বাধীন পেশাজীবী সম্প্রদায় প্রশ্নবিদ্ধ হোক, তা চায় না সংগঠনটি।
প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া কাজের আদেশ, কৃত্রিম মূল্যায়ন, অনলাইন বাজারে কারসাজি কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘনকে সমর্থন করে না বেসিস। সংগঠনটির মতে, অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুতর অভিযোগ উপেক্ষা করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বেসিসের সদস্য হলে সংগঠনটির গঠনতন্ত্র, সদস্য আচরণবিধি ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি যাচাই করা হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গুরুতর অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য উপাদান পাওয়া গেলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সদস্যপদ সাময়িক স্থগিতের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সদস্য বা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বেসিসের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সদস্যপদ স্থগিত, বাতিল বা অন্য সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের বৈধ তদন্ত বা অনুসন্ধানে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথাও জানিয়েছে বেসিস। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সাইবার অপরাধসংশ্লিষ্ট সংস্থা, পুলিশ বা অন্য আইন প্রয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান তথ্য বা সহযোগিতা চাইলে আইনি সীমার মধ্যে তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
ক্ষতিগ্রস্ত স্বাধীন পেশাজীবী, সাবেক কর্মী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও শুনতে চায় বেসিস। কারও জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যক্তিগত তথ্য বা আন্তর্জাতিক অনলাইন কর্মবাজারের হিসাব অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়ে থাকলে কিংবা কোনো হিসাবের নিয়ন্ত্রণ অন্য পক্ষের হাতে থাকার অভিযোগ থাকলে তা জানানোর জন্য অভিযোগ ও প্রমাণ সংগ্রহের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তথ্যদাতাদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিটোপিয়াকে ঘিরে অভিযোগকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ফ্রিল্যান্সিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বেসিস।
একজন স্বাধীন পেশাজীবীর নামে তৈরি অনলাইন কর্মবাজারের হিসাবের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টসহ ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে পারবে, চাকরি শেষ হলে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও ডিজিটাল পরিচয়ের মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং একটি কোম্পানি বা সংস্থা কতগুলো ব্যক্তিগত হিসাব পরিচালনা করতে পারবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে সংস্থাভিত্তিক কাজ ও ব্যক্তিগতভাবে কাজের সীমারেখা নির্ধারণেও নীতিমালা প্রয়োজন বলে মনে করে বেসিস। সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘জাতীয় ফ্রিল্যান্সিং ও মার্কেটপ্লেস পরিচালনা কাঠামো’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস, সরকার, বেসিস, ব্যাংক, অর্থ লেনদেন সেবা প্রতিষ্ঠান ও ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে বেসিস। স্বাধীন পেশাজীবীদের পারিশ্রমিক গ্রহণ, আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা, ব্যাংকিং, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, করসংক্রান্ত অস্পষ্টতা এবং ডিজিটাল পরিচয় সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
কোনো ব্যক্তি বা কয়েকজনের অনিয়মের দায় পুরো ফ্রিল্যান্সিং খাতের লাখো সৎ পেশাজীবীর ওপর বর্তানো উচিত নয় বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকলে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিরপরাধ কর্মী, ফ্রিল্যান্সার বা প্রতিষ্ঠান যেন হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
বেসিস জানিয়েছে, সংগঠনটি কারও পক্ষ নেবে না, কোনো অভিযোগ ধামাচাপা দেবে না এবং তদন্তের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী ঘোষণা করবে না। স্বচ্ছ তদন্ত, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া, ক্ষতিগ্রস্তদের সুরক্ষা এবং দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সুনাম রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথাও জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বেসিস সহায়ক কমিটির সদস্য ও সলিউশন ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল্লাহ ইবনে নূরুল ইসলাম, সহায়ক কমিটির সদস্য আহসান হাবিব, ফেরদৌস আলম, ফুয়াদ হাসান প্রমুখ।