• ২২ বিলাসবহুল গাড়ি বুঝে নিল তরুণ-তরুণীদের পরিবার
• পুলিশের বাড়ি বলে কেউ মুখ খুলত না ভয়ে।
• পার্টিতে ছিল এক ডিআইজির দুই মেয়েও।
গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানের পর রাজধানীর খিলক্ষেতে পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের সেই বাড়িটির সকল কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। বাড়িটির প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। সামনে বসানো হয়েছে পুলিশ পাহারা। গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে এ চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক দিন আগেও মাসে ২০ থেকে ২২ দিন ওই বাড়িতে উচ্চ শব্দে গানবাজনাসহ চলত রেভ পার্টি। চলত অনৈতিক কর্মকাণ্ডও। ছিল জমজমাট। তবে গতকাল ছিল সুনসান নীরবতা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের উত্তরে অবস্থিত পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১-এর ৪ নম্বর সেক্টর। গাছে ঘেরা তিনতলা বাড়িটি আব্দুল্লাহ আল জহিরের। অন্য প্লটগুলোর মালিকদের নাম-পরিচয় থাকলেও জহিরের এই বাড়িটির কোথাও তাঁর নাম-পরিচয় নেই। প্রধান ফটকের সামনের ফটকের বাঁ পাশের পিলারে কেবল ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ লেখা রয়েছে। বাড়িটির চারপাশ উঁচু দেয়াল ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাড়ির প্রবেশপথে নিরাপত্তার জন্য ছোট একটি কক্ষ রয়েছে।
বাড়ির সামনে কয়েকটি ব্যক্তিগত গাড়িও পড়ে থাকতে দেখা যায়। বাড়িটির সামনে একজন পুলিশ সদস্যকে গতকাল দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তিনি জানিয়েছেন, গাড়িগুলো ওই অভিযানে আটক করা।
গাড়িগুলো পরে বিকেলের দিকে মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন আজকের পত্রিকাকে জানান, ডিবি পুলিশ গাড়িগুলো মালিকদের বুঝিয়ে দিয়েছে, তিনি কিছু জানেন না। গতকাল বিকেল পর্যন্ত ওই বাড়ির সামনে থেকে ২২টি বিলাসবহুল গাড়ি বুঝিয়ে দিয়েছে পুলিশ।
সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, ৪ নম্বর সেক্টরের বাড়িটির আশপাশে বেশির ভাগ প্লট ফাঁকা। কোথাও বাগান, কোথাও নির্মাণকাজ চলছে। কয়েকটি প্লটে তত্ত্বাবধায়কদের থাকার জন্য ছোট টিনের ঘর তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব প্লটের মালিকদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। সাবেকদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে থাকেন। প্লটগুলো দেখাশোনা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য কর্মচারী রাখা আছে।
একজন তত্ত্বাবধায়ক বলেন, মাসে দুবার তাঁরা এসে প্লট পরিষ্কার করেন ও দেখাশোনা করেন। সন্ধ্যার পর মাঝেমধ্যে আশপাশ থেকে উচ্চ শব্দে গানবাজনা শোনা যেত। তবে পুলিশ কর্মকর্তার বাড়ি হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না।
ময়দুল ইসলাম নামে এক রাজমিস্ত্রি বলেন, সপ্তাহে দুই-তিন দিন বাড়িটিতে জোরে গানবাজনা হতে দেখেছেন তিনি।
আব্দুল আলিম নামের এক স্থানীয় জানান, ভয়ে অনেকে কেউ কিছু বলতেন না। তবে অনৈতিক কর্মকাণ্ড হতো তাঁরা জানতেন।
বাড়িটির কিছু দূরেই খিলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি। চলতি বছরের ৮ মে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির ফাঁড়িটি উদ্বোধন করেন। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এত কাছাকাছি পুলিশ ফাঁড়ি থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরে এমন আয়োজন চললেও তা বন্ধে আগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন?
এর দায় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের ওপর চাপালেন খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনি সেখানকার দায়িত্বরত আইসির কাছে জিজ্ঞাসা করেন।’ পরে খিলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নম্বরে ফোন করা হলে সেটি ব্যস্ত দেখা যায়।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই এলাকায় সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলা হয়। এরপর নজরদারি কমে যাওয়ায় বাড়িটিতে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো সহজ হয়েছিল বলে তাঁদের ধারণা।
ডিবি সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটি ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হতো। ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং কো-হোস্ট ছিলেন মাহবুবুল আলম।
মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির জানান, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। অনলাইনে পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় বুকিং দিয়ে পার্টিতে অংশ নিতে হতো।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম জানান, বাড়িটির মালিক আব্দুল্লাহ আল জহির সেটি ভাড়া দিতেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক সেবন ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলার অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মদ, ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও গাঁজাসদৃশ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিসি ইলিয়াস কবিরের ভাষ্য, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণ-তরুণীরা কক্ষ বুকিং করে এসব পার্টিতে অংশ নিতেন। পার্টি থেকে পাওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ অতিরিক্ত ডিআইজি জহির এবং ৩০ শতাংশ তাঁর স্টাফরা পেতেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযানের সময় সেখানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ব্যাংকারসহ ৮৪ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন তরুণী ছিলেন। একজন ডিআইজির দুই মেয়েও ছিলেন।
তবে ওই পার্টি থেকে আয়ের ভাগ ও কার্যক্রম সম্পর্কে নিজের দায় অস্বীকার করেছেন আব্দুল্লাহ আল জহির। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, জায়গা ভাড়া দিয়ে তিনি ৭০ শতাংশ পেতেন। বাড়ির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার জন্য তাঁর কর্মীরা পেতেন ৩০ শতাংশ। নিয়মকানুন জানিয়ে জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভাড়া নেওয়ার পর সেখানে কেউ অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াবেন, তা তিনি জানতেন না।
এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন ডিসি ইলিয়াস কবির। অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয় বলেও জানান তিনি। অভিযানের পর জহিরকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট কিছু বলতে পারেনি ডিবি পুলিশ।