রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটির পুরোটাই ব্যবহৃত হতো ব্যাগ, প্লাস্টিক ও বিভিন্ন পণ্যের গুদাম হিসেবে। আগুনে মুনসুর খান প্লাজা ভবনটির ষষ্ঠ তলার প্রায় সব মালপত্র পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাশের আরএম প্লাজার ষষ্ঠ ও সপ্তম তলাও।
ব্যবসায়ীদের দাবি, শুধু একটি গুদামেই ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি মালপত্র পুড়ে গেছে। সব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
গতকাল সোমবার বিকেলে আগুন লাগার পর আজ মঙ্গলবার ভোরে তা নিয়ন্ত্রণে আনার কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস।
তবে আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত গুদামগুলো থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ভেতরে জমে থাকা মালপত্রের নিচে আগুনের উত্তাপ থাকায় আবার আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কায় পানি ছিটানো ও মালপত্র সরানোর কাজ চলছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, মুনসুর খান প্লাজার ষষ্ঠ তলার সব মাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সপ্তম তলার কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশের আরএম প্লাজার ষষ্ঠ ও সপ্তম তলাও পুড়ে গেছে। সেখান থেকেও ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
ব্যবসায়ীরা জানান, গুদামগুলোর ভেতরে ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, ছাতা, জুয়েলারি, পারফিউম, প্রসাধনসামগ্রী ও ইলেকট্রনিক পণ্য মজুত ছিল। মুনসুর খান প্লাজার প্রথম থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত মার্কেট এবং ওপরের তলাগুলোতে বিভিন্ন পণ্যের গুদাম রয়েছে।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও পাশের আরএম প্লাজা মিলিয়ে ১২-১৪টি গুদামসহ কয়েকটি দোকানের মালপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে।
তবে মুনসুর খান প্লাজার করিম ব্যাগ হাউসের স্বত্বাধিকারী আব্দুল করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ভবনটির ষষ্ঠ তলায় তাঁর ব্যাগের গুদাম ছিল। সেখানে ১ কোটি ১০ লাখ টাকার বেশি মালপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
গুদামে কাজ করা কর্মচারী মো. সাকিব বলেন, আগুনের তীব্রতা কমলেও ধোঁয়ায় আশপাশে থাকা মালপত্রের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কালার কসমেটিকস ও ব্যাগের গুদামে থাকা অনেক পণ্য ধোঁয়ায় কালো হয়ে গেছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামান আজ সকালে সাংবাদিকদের জানান, অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে প্রথমে লালবাগ, সিদ্দিকবাজার ও পলাশী থেকে ছয়টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরে আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনায় ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ভোর ৫টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে গুদামের ভেতরে প্রচুর ধোঁয়া ও তাপ থাকায় আগুন নির্বাপণের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
এই কর্মকর্তা বলেন, গুদামগুলো শাটার ও একাধিক তালা দিয়ে বন্ধ ছিল। প্রচণ্ড তাপ ও ধোঁয়ার মধ্যে তালা কেটে ভেতরে প্রবেশ করে আগুন নেভাতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। সরু সড়ক, যানজট এবং ভবনের ভেতরে ধোঁয়া বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়েছে। এ ছাড়া আশপাশের পানির রিজার্ভারগুলো বারবার খালি হয়ে যাওয়ায় পানি সরবরাহেও সমস্যা হয়েছে।
কাজী নজমুজ্জামান আরও বলেন, গুদামগুলোতে ছাতা, প্রসাধনসামগ্রী, আতর, আতরের বোতলসহ বিভিন্ন পণ্য মজুত ছিল। এসব মালপত্রের নিচে তাপ ও ধোঁয়া থাকায় পণ্য সরিয়ে পানি দিতে হচ্ছে। সেগুলোর সরানো না হলে আবার আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে কাজ করছেন।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আগুনের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনা থাকলেও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। আগুন নির্বাপণের পর তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত নির্ধারণ করা হবে।
অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসের চার সদস্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাঁরা হলেন পলাশী ফায়ার স্টেশনের ফায়ারফাইটার মো. জিল্লুর রহমান ও লিডার মো. নজরুল ইসলাম, সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো. মারুফ এবং খিলগাঁও ফায়ার স্টেশনের লিডার মো. মাহাফুজুর হক মজুমদার। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আগুন যেন আশপাশের মার্কেট ও ভবনে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা, স্বেচ্ছাসেবক, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থা কাজ করেছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষও পানি সরবরাহ করেছে।