বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা, বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিপূরণ ঋণের পরিবর্তে অনুদান হিসেবে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব দাবি জানানো হয়। পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা), ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশসহ ৩৬টি সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং বহুজাতিক করপোরেশনের মুনাফাকেন্দ্রিক নীতির সমালোচনা করেন।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের গবেষণাপ্রধান মো. ইকবাল ফারুক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বাংলাদেশের মানুষকেই বহন করতে হচ্ছে। অথচ ঋণসহায়তার নামে চাপিয়ে দেওয়া অর্থনৈতিক বোঝা মানুষের মৌলিক অধিকার সংকুচিত করছে। কৃষক, নারী, শিশু ও সর্বস্তরের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম বলেন, ন্যায্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন ও গণসচেতনতা গড়ে তোলা হচ্ছে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ২ শতাংশ, যা পর্যাপ্ত নয়। এই অংশ ক্রমান্বয়ে ৪০ শতাংশ থেকে শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার বাস্তবায়ন দেখতে চান।
সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় মানুষ জলবায়ু সংকট, ঋণের বোঝা, সুপেয় পানির অভাব, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকটে বিপর্যস্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ঋণ নয়, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি উপকূল সুরক্ষা, নিরাপদ পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক এবং ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম দুর্যোগের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি খাতের অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। একই সময়ের মধ্যে জলবায়ুর প্রভাবে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হতে পারে।
তিনি বলেন, এই সংকটের মূল্য দিচ্ছেন কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ। ঐতিহাসিকভাবে অধিক নিঃসরণকারী দেশগুলোকে দায় স্বীকার করে ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সেই অর্থ দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। ন্যায্য ক্ষতিপূরণ কোনো দয়া নয়, এটি তাঁদের অধিকার।
গর্জন সমাজ কল্যাণ সংস্থার ফারজানা ঊর্মি বলেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ হবে। পানিদূষণ, উপকূলীয় জেলে ও লবণচাষিদের জীবিকা হারানো এবং সুন্দরবনের ক্রমাবনতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
মানববন্ধন থেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার সুরক্ষা এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়।