কুমিল্লার দেবিদ্বারের ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তিন সদস্যকে অবৈধভাবে বাংলাদেশের নাগরিক সনদ (জন্মনিবন্ধন) দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি জেলা প্রশাসনের তদন্তে ধরা পড়েছে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের ২০ দিন পার হলেও অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সচিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল আলম গত ৭ জুলাই ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল এবং সাবেক ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে জেলা প্রশাসনের তদন্ত দল ৬ আগষ্ট একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে সনদে উল্লেখিত তথ্যের সঙ্গে জন্মসনদধারী ব্যক্তির ঠিকানার কোনো মিল নেই এবং স্থানীয় কেউ তাদের চেনে না এবং সনদধারীরা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা নন বলে উল্লেখ করা হয়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার পতনের পর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা কামরুজ্জামান মাসুদের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ইউপি সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. সালাউদ্দিন রুহুল। দায়িত্ব পাওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ৯ লাখ টাকার বিনিময়ে ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ, মুবিনা খাতুন ও হাফিছা নামের তিনজনকে বাংলাদেশি জন্মসনদ প্রদানের অভিযোগ উঠে আসে। এ ঘটনায় গত ২৯ জুলাই কুমিল্লা জেলার গোয়েন্দা শাখা (বিশেষ নজরদারি উইং) তাদের তদন্তের মাধ্যমে ফতেহাবাদ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন রুহুল ও ইউপি সচিব নজরুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি কুমিল্লা জেলা প্রশাসক বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দেন। ওই তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতির অভিযোগ এনে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় অখণ্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে গণ্য করা হয়। এ ছাড়া সরকারি চাল আত্মসাৎ, উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়ম ও প্রতিবন্ধীকে মারধরের অভিযোগ উঠে আসে তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে।
সম্প্রতি তিন রোহিঙ্গার জন্মসনদ জালিয়াতির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অন্তত ২৫ জন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যের জন্মনিবন্ধন সনদ প্রদানের তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রতিটি জন্মসনদ তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকায় দেওয়া হতো বলে জানা গেছে। তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন রুহুলকে একাধিকবার ফোন দিলেও কোনো সাড়া মেলেনি। তবে এর আগে এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, অভিযোগে উল্লেখিত জন্মসনদগুলো তাঁর সময়ে তৈরি হয়নি। অভিযোগ করার আগে তিনি কারা কিভাবে এ জন্মনিবন্ধন করেছেন—এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
জানতে চাইলে অভিযুক্ত ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ফতেহাবাদ ইউনিয়নে রোহিঙ্গা জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। আমি ২০২৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ছুটিতে ছিলাম। এই সময়ে আমার পাসওয়ার্ডে উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া রাজীব কাজ করেছিল, মেম্বার চেয়ারম্যানের অনুরোধে তাঁকে পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। আমি এখন মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নে কর্মরত।
ইউপি উদ্যোক্তা আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার নিকট ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সচিব নজরুল ইসলাম নিজেই বলেছেন, উক্ত ব্যাক্তিগুলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নয়। তাহলে এখন তিনি অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে কোনো লাভ আছে? তা ছাড়া আমি কখনো নিবন্ধনের পাসওয়ার্ড ব্যাবহার করিনি।
এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা বলেন, তিনটি জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে প্রেরণ করেছি। জেলা প্রশাসক রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয় বরাবর রিপোর্ট পেশ করবেন। রেজিস্ট্রার জেনারেল অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অন্যান্য জন্মনিবন্ধনের বিষয়ে শুনেছি অভিযোগ করা হয়েছে, তবে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।