হোম > সারা দেশ > কক্সবাজার

কক্সবাজার সৈকত: গুপ্তখালে মারা পড়ছে পর্যটক

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়া হলেও সতর্কতা না মেনে সেখানে নেমে পড়ছেন পর্যটকেরা। সম্প্রতি সৈকতের লাবণী পয়েন্টে। ছবি: আজকের পত্রিকা

হাওর থেকে আট বন্ধুর সঙ্গে গত বুধবার কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসেছিলেন কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ার তরুণ মোফাজ্জল ইমাম সীমান্ত (২০)। ভ্রমণ শেষে শনিবার তাঁদের ফেরার কথা ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় বন্ধুরা মিলে সৈকতের সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের মাঝামাঝি গোসলে নেমে সীমান্তসহ তিন বন্ধু সাগরে তলিয়ে যান। তাৎক্ষণিক দুজনকে উদ্ধার করা গেলেও নিখোঁজ হন সীমান্ত।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর একই সৈকতে ভেসে আসে সীমান্তের নিথর দেহ। তিনি কিশোরগঞ্জের ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। শুধু সীমান্ত নন, শহরের লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত শুধু তিন কিলোমিটার সৈকতে চলতি বছরের জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে।

সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী এবং আশপাশের সৈকতে ছুটির দিনগুলোতে লাখো পর্যটকের সমাগম হয়। জনপ্রিয় এসব সৈকতে আসা পর্যটকদের বড় অংশ গোসলে নামতে চায়। তবে অনেকে সাগরের আবহাওয়ার পরিবেশ কিংবা নির্দেশনা না মেনে গোসলে নেমে বিপদে পড়ছে।

অবশ্য গোসলে নেমে কতজনের প্রাণহানি ঘটেছে, তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি কোনো দপ্তরে নেই। কক্সবাজার শহরের সৈকতের তিন পয়েন্টে ২০১৪ সাল থেকে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের দায়িত্বে আছে বেসরকারি সংস্থা সি-সেফ লাইভ গার্ড। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৭৭ জনকে। গত তিন বছরে মারা গেছে ৪০ জন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ২০২৫ সালে, ২০ জনের।

নাজিরারটেক থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সৈকত ঘুরে অন্তত ২০টি গুপ্তখাল দেখা গেছে। সৈকতের জোয়ার-ভাটা অঞ্চলের বালিয়াড়ি ভাগ করে এসব খাল বা খাদ সৃষ্টি হয়েছে। এসব খাদের কারণে পর্যটকেরা সরাসরি সাগরের ঢেউয়ের কাছাকাছি যেতে পারছে না। অন্যদিকে লাবণী থেকে কলাতলী পর্যন্ত সৈকতের তীর দিয়ে বৃষ্টির পানি নেমে অন্তত ৫টি খাল সৃষ্টি হয়েছে।

গোসলে অসতর্ক পর্যটক

কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক থেকে টেকনাফের বদরমোকাম পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত। কিন্তু বিশ্বের দীর্ঘতম বালুকাময় এই সৈকতে শহরের লাবণী থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার জায়গায় শুধু গোসলে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারের ব্যবস্থা আছে। বাকি বিস্তীর্ণ সৈকতে আর কোথাও এই ব্যবস্থা নেই। ফলে গোসলে নেমে গুপ্তখাল কিংবা উল্টো স্রোতে ভেসে গিয়ে প্রাণহানি বাড়ছে।

সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের বড় অংশ গোসলে নেমে পড়ে জানিয়ে জেলা প্রশাসনের বিচ কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুব আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গুপ্তখাল বা গভীর খাদ সৃষ্টি হওয়া সৈকতে গোসল থেকে বিরত থাকতে লাল নিশানা টাঙিয়ে দেওয়া হয়, পাশাপাশি মাইকিং করে সতর্ক করা হয়। কিন্তু পর্যটকদের কেউ কেউ সতর্কতা না মেনে গোসলে নেমে বিপদে পড়ছে।’

কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়িতে সৃষ্টি হওয়া গুপ্তখাল। সম্প্রতি সৈকতের নাজিরারটেক এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

শহরের সাগরতীরের পাঁচ তারকা মানের হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক (রিজার্ভেশন) আবু তালেব শাহ বলেন, ‘আমরা বেড়াতে আসা পর্যটকদের সৈকতে নামার আগে জোয়ার-ভাটা এবং সাগরের পরিবেশ বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করছি। কিন্তু অনেকে অসচেতন অবস্থায় সাগরে নেমে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে।’

তিন কিলোমিটার এই সৈকতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন সি-সেফ লাইফ গার্ডের ২৭ জন কর্মী। অনেক সময় বিপুলসংখ্যক পর্যটককে নজরদারিতে রাখা কঠিন জানিয়ে সি-সেফের ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গত তিন বছরে সাগরের ধরন পাল্টে গেছে। সৈকতের তীর ভাঙনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখালের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নজরদারির বাইরে থাকা সৈকতে দুর্ঘটনা ঘটছে।’

সাম্প্রতিক বছরে ভ্রমণে এসে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সৈকতে নামার আগে পর্যটকদের কী ধরনের সতর্কতা মেনে চলা দরকার কিংবা করণীয় কী, তা প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’

গুপ্তখাল নিয়ে যা বলছেন সমুদ্রবিজ্ঞানী

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব এবং বোরির সাবেক মহাপরিচালক সমুদ্রবিজ্ঞানী সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার বলেন,‘ সাধারণত সমুদ্রের তলদেশ যদি অসমতল কিংবা খাঁজ কাটার তীররেখা থাকে, তাহলে গুপ্তখাল সহজে তৈরি হয়। এ ছাড়া যখন খারাপ আবহাওয়া থাকে এবং ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সময়ে সমুদ্রে যখন খুব উচ্চ মাত্রায় ঢেউ থাকে, তখনো তৈরির আশঙ্কা থাকে।’ তিনি বলেন, এটি তৈরিতে বাতাসেরও প্রভাব রয়েছে। যদি উপকূলে সমান্তরালভাবে বাতাস বইয়ে যায় এবং এই সমান্তরাল বাতাসের কারণে তরঙ্গের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তাতেও তৈরি হতে পারে। একজন দক্ষ সাঁতারুও যদি এই গুপ্তখালে আটকা পড়েন, তাহলে তাঁরও রক্ষা পাওয়ার কোনো উপায় থাকে না বলে জানান সাঈদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘গুপ্তখালে আটকা পড়লে সাঁতার কেটে কূলে ফিরে আসার চেষ্টা করা যাবে না। এ সময় আটকে পড়া ব্যক্তিকে শান্ত থাকার পাশাপাশি পানিতে ভেসে থাকতে হবে। বাঁয়ে বা ডানে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।’

সৈকতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যটকদের সতর্ক করতে লাইফ গার্ড, বিচ কর্মী ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সক্রিয় বলে জানান জেলা প্রশাসক ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি মো. আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে লাইফ গার্ড সেবা ও বিচ কর্মীদের কর্মপরিধি বাড়ানোর বিষয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে; পাশাপাশি উদ্ধার তৎপরতার সরঞ্জাম এবং মেডিসিন সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।’