সাগর উপকূলেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা জাফর আলমের। বয়স ৫৫ বছর ছুঁই ছুঁই। বাপ-দাদার পথ অনুসরণ করে ৩৫ বছর ধরে জড়িয়ে আছেন জেলে পেশায়। অন্য কোনো পেশা তাঁর তেমন আয়ত্তে নেই। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর প্রায় এক যুগ আগে ছোট আকারের একটি নৌকার মাঝির দায়িত্ব নেন। সাগরের আবহাওয়া সম্পর্কেও তাঁর রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা। তবে এ বছর সাগরের যে আচরণ দেখেছেন, তা তাঁর ৩৫ বছরের অভিজ্ঞতায় ব্যতিক্রম।
জাফর আলম কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটার বাসিন্দা। তিনি জানান, চলতি বছরের ১১ জুন সাগরে মাছ ধরার ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর থেকেই ঘন ঘন বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়তে হয়েছে। তিন বছর ধরে এ পরিস্থিতির কারণে তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে ৭ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে ইলিশের প্রজনন মৌসুম উপলক্ষে আবারও ২২ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে।
জাফর আলমের মতো মাছ ধরার ভরা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৬৪ হাজার জেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মাছ ধরার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল জেলেদের পাশাপাশি কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, উখিয়া, কক্সবাজার সদর, ঈদগাঁও ও টেকনাফের মৎস্য ব্যবসা, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত আরও অন্তত ২ লাখ মানুষ জীবিকার অনিশ্চয়তায় পড়েছে। সবচেয়ে বেশি লোকসানের মুখে পড়েছেন সাগর ও নদীর মোহনায় চলাচল করা ছোট-বড় প্রায় ৭ হাজার ট্রলারের মালিক।
আবহাওয়ার বৈরী আচরণে শুধু সাগরে মাছ ধরার কার্যক্রমই ব্যাহত হচ্ছে না; প্রভাব পড়ছে লবণ উৎপাদন, কৃষি ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতেও।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) কক্সবাজার লবণশিল্পের উন্নয়ন কেন্দ্রের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, গত লবণ চাষ মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত) আগাম বৃষ্টির কারণে অন্তত ৩৯ দিন লবণ উৎপাদন ব্যাহত হয়। ওই মৌসুমে ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছে ১৯ লাখ ৪৫ হাজার টন। চলতি বছরের জুলাইয়ে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও সামুদ্রিক জোয়ারের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যা ও দুর্যোগেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা, ট্রলারমালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১১ বার সতর্কসংকেত দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে চলতি বছরই আবহাওয়ার বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। তিন-চার বছর ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে সতর্কসংকেতের সংখ্যা বেড়েছে।
বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বোরি) সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই কিবরিয়া বলেন, আবহাওয়ার চরম ও দ্রুত পরিবর্তন এবং ঘন ঘন সমুদ্র সতর্কবার্তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রভাবের অন্যতম স্পষ্ট উদাহরণ।
কক্সবাজার উপকূলের মানুষ এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলের জন্য দুর্যোগের আগাম তথ্য পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ছিল কক্সবাজার রাডার স্টেশন। কিন্তু ২০২৩ সালের ২ আগস্ট থেকে অচল রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় ৪৪০ কিলোমিটার এলাকার আবহাওয়ার গতিবিধি পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা ছিল রাডারটির। ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারী বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়ার মতো আবহাওয়ার পরিবর্তনের তথ্য কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সংগ্রহ করে ভি-স্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, নতুন রাডার স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।
কুতুবদিয়ার তাবলেরচর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবুল কালাম। তাঁর স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট ১৯৬০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা। তিনি জানান, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সতর্কবার্তা দু-তিন দিন আগে প্রচার করা হলেও অনেকে এত বড় দুর্যোগ হবে, তা ভাবেননি। অনেকে সতর্কবার্তাকে গুরুত্বও দেননি। ফলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১৯৯১ সালের মতো বড় ঘূর্ণিঝড় না হলেও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন এবং ঘন ঘন সতর্কসংকেত জারির কারণে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট, বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপসে নিয়মিত আবহাওয়ার তথ্য প্রচার করা হলেও অনেক জেলে ও উপকূলের মানুষ এখনো সতর্কসংকেতের তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝেন না।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা বলেন, জেলে ও ট্রলারমালিকদের আবহাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে কার্যক্রম চলছে। পাশাপাশি নৌযানগুলোতে জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়ার সতর্কবার্তা শুধু কারিগরি পরিভাষায় নয়, আরও সহজ ও স্থানীয় মানুষের বোধগম্য ভাষায় প্রচারের ওপর জোর দিয়েছেন বোরির সামুদ্রিক পরিবেশ ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই কিবরিয়া।
সমুদ্র ও মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় শুধু সতর্কবার্তা প্রচার করলেই হবে না; জেলেদেরও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। সাগরে যাওয়ার আগে নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রিয়েল-টাইম জিপিএস ট্র্যাকিং এবং সমুদ্রের সম্ভাব্য মাছের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ জন্য জেলেদের আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য প্রযুক্তি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, দূষণসহ নানা কারণে সমুদ্রে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ ও সামুদ্রিক প্রাণীর ওপর। এই পরিস্থিতিতে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং জেলেদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
সাগরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তার সঠিক তথ্য তুলে আনতে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক কমোডর শাহীদ আহমেদ। তিনি বলেন, একই সঙ্গে মাছ ধরার নিষিদ্ধকাল এবং বৈরী আবহাওয়ার সময়ে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।