হোম > সারা দেশ > কক্সবাজার

সিটি করপোরেশন করার উদ্যোগ: বাড়ছে কক্সবাজারের পরিধি

মাইনউদ্দিন শাহেদ, কক্সবাজার

পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সিকরপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। গতকাল কলাতলী এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান কক্সবাজার পৌরসভাকে সম্প্রসারণ করে রামু ও কক্সবাজার সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের কিছু এলাকা অন্তর্ভুক্ত করে বৃহত্তর নগর প্রশাসন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে ৩২ দশমিক ৯০ বর্গকিলোমিটারের সদর পৌরসভা সম্প্রসারিত হয়ে প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের আয়তন দাঁড়াবে ১৬৯ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু নামে সিটি নয়, নাগরিক সেবার মানও বাড়াতে হবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে।

প্রস্তাবিত সীমানায় কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, ঝিলংজা ও পিএমখালী ইউনিয়ন এবং রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নের একটি অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কক্সবাজার পৌরসভার প্রস্তাব ও প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, সম্প্রসারিত এলাকার বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের উমখালী, দক্ষিণ মিঠাছড়ি ও চেইন্দা মৌজার ১৮ বর্গকিলোমিটার এবং খুনিয়াপালং ইউনিয়নের ধেছুয়াপালং মৌজার ৪৭ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আসবে। এ ছাড়া কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের খুরুশকুল ও তেতৈয়া মৌজার ২৩ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার, পিএমখালী ইউনিয়নের তোতকখালী ও পিএমখালী মৌজার ২৭ দশমিক ২৫ বর্গকিলোমিটার এবং ঝিলংজা ইউনিয়নের ঝিলংজা ও খুরুলিয়া মৌজার ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কক্সবাজার পৌরসভা ১২টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পৌরসভার জনসংখ্যা ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৫। তবে পৌরসভার প্রশাসনিক প্রতিবেদনে বর্তমানে শহরে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বসবাস করে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত তিন দশকে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন ও যোগাযোগ অবকাঠামোর বিস্তারের সঙ্গে শহরের বাস্তব পরিধি পৌরসভার সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। শহরের সঙ্গে লাগোয়া ইউনিয়নগুলোর বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠছে। ফলে একদিকে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আশপাশের সম্প্রসারিত এলাকাগুলোও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার-৩ (সদর, রামু ও ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই নগর হিসেবে গড়ে তুলতে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই কক্সবাজার ঘিরে এই পরিকল্পনা নিয়েছে।

দাবি দীর্ঘদিনের

দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার। পর্যটন মৌসুমে শহরে মানুষের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মী, পরিবহনশ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড মিলিয়ে নগর ব্যবস্থাপনার ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। পৌরসভার কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদ্যমান পৌর কাঠামোর মধ্যে থেকে এই বিস্তৃত নগর এলাকার পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে। পাশাপাশি যানজট, জলাবদ্ধতা এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতেও হিমশিম খেতে হয় পৌর কর্তৃপক্ষকে।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কক্সবাজারের মতো পর্যটননির্ভর শহরের ক্ষেত্রে নগর-পরিকল্পনার সঙ্গে পরিবেশ, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জলাভূমি ও পর্যটন অবকাঠামোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিদ্যমান পরিবেশ-প্রতিবেশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) জেলার জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে। এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং পরিকল্পিত পর্যটন নগরী গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মহাপরিকল্পনার কাজ শেষ হবে।

নগরীর জন্য নতুন সম্ভাবনা

সিটি করপোরেশন হলে বৃহত্তর এলাকার জন্য সমন্বিত নগর-পরিকল্পনা গ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে। সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ, সড়কবাতি, নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা, বাজার ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো বিষয়গুলোকে একই প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে পর্যটন ব্যবস্থাপনাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। পর্যটনকেন্দ্রিক সড়ক ও ফুটপাত উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গণশৌচাগার, পার্কিং, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, পর্যটক নিরাপত্তা এবং জনবান্ধব নগরসেবা একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ ছাড়া বিমানবন্দর, সমুদ্রসৈকত, মেরিন ড্রাইভ, হোটেল-মোটেল জোন এবং শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া গেলে পর্যটন অর্থনীতির আরও বিস্তার ঘটতে পারে।

কক্সবাজার শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা বর্জ্য ও দূষণ বলে মনে করেন কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক রেজাউল করিম মোহাম্মদ তারেক। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে এ সমস্যার দৃশ্যমান উন্নতি আশা করা যায়।

সীমানা চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষা

গত ৩১ আগস্ট প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণ সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ইতিমধ্যে অধিকাংশ শুনানি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চলতি মাসের মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম শেষ করা গেলে আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে কক্সবাজার দেশের ১৪তম সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করতে পারে।

কক্সবাজার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ও পৌরসভার প্রশাসক শামীম আল ইমরান বলেন, প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণের গণশুনানি চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই সীমানা চূড়ান্ত হবে।

এদিকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার সফর করতে পারেন বলে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ বদরী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ সফরে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উদ্বোধন এবং কক্সবাজার ব্লু ইকোনমি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। এর মধ্যে সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ হলে কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের ঘোষণাও দিতে পারেন তিনি।