চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে মধ্যরাতে আকস্মিক পরিদর্শনে এসেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান। নির্ধারিত সময়সূচি পরিবর্তন করে গত বুধবার রাতে হঠাৎ হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে তিনি অব্যবস্থাপনা, রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম এবং প্যাথলজি বিভাগের অকার্যকর কার্যক্রমের চিত্র দেখতে পান।
পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন অনিয়ম ও ভুয়া নথি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এডিজি। এ সময় হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাসকে দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়মের জন্য সতর্ক করে তিনি বলেন, এসব কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।
নির্ধারিত তদারকির সময় ছিল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা। তবে বিশেষ প্রশাসনিক প্রয়োজনে ঢাকায় ফিরতে হওয়ায় কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বুধবার রাতে হাসপাতালে আসেন এডিজি। তাঁর আকস্মিক উপস্থিতির খবরে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা যায়। এ সময় দ্রুত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালাতেও দেখা যায়।
পরিদর্শনকালে এডিজি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, বিভিন্ন ওয়ার্ড, ওষুধ সংরক্ষণাগার ও প্যাথলজি বিভাগ ঘুরে দেখেন। পাশাপাশি চিকিৎসাধীন রোগী ও তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসকদের উপস্থিতি, চিকিৎসাসেবার মান এবং খাবার সরবরাহের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে খোঁজ নেন।
তদারকির সময় রোগীদের জন্য বরাদ্দ খাবার সরবরাহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পান এডিজি। বিশেষ করে মাছ ও মাংসের নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম দেওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি এবং ঠিকাদারদের অনিয়ম ঠেকাতে ব্যর্থতার জন্য আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ফারহানা ওয়াহিদ তানি ও হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাসকে কঠোর নির্দেশনা দেন এডিজি। তিনি বলেন, ঠিকাদারদের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এর দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
এরপর প্যাথলজি বিভাগ পরিদর্শনে গিয়ে আরও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা। জেলা পর্যায়ের ১০০ বা তারও বেশি শয্যার একটি বড় সরকারি হাসপাতালে দৈনিক গড়ে মাত্র ৩০ থেকে ৩৯টি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা হওয়ার তথ্য দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
নথিপত্র পর্যালোচনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্তদের স্বাক্ষর না থাকায় সেখানে কাল্পনিক ও ভুয়া তথ্য লিপিবদ্ধ করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন এডিজি। অটোমেশন প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে এমন অকার্যকর ব্যবস্থা কেন চালু রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন করেন তিনি।
প্যাথলজির রেজিস্টারে অনিয়মের অভিযোগ তুলে হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের উদ্দেশে এডিজি বলেন, ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে খাতায় ভুয়া তথ্য লেখা অপরাধের শামিল। আপনি যা করছেন, এগুলো ক্রাইম—আর এর পূর্ণ দায় আপনার।’
হাসপাতালের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, জেলা হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান চিত্র অত্যন্ত বিশৃঙ্খল। শয্যা, জনবল ও খাদ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নেই। তিনি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য খাতের এ সংকট নিরসনে সরকার দ্রুত সারা দেশে ৫ হাজার চিকিৎসক এবং ৪৫ হাজার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে ২৮টি জেলায় এ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে চুয়াডাঙ্গাতেও পূর্ণাঙ্গ জনবল পদায়ন করা হবে।
দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনতে নিয়মিত এ ধরনের তদারকি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান এডিজি।