পার্বত্য চুক্তিবিরোধী সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) সমর্থিত ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’ নামে সংগঠনের ডাকে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথে অবরোধ শেষ হয়েছে। অবরোধ চলাকালে সড়কে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেলে করে এক পাহাড়ি তরুণ বন্দুক নিয়ে সড়কে মহড়া দিচ্ছেন—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ শনিবার ইউপিডিএফ সমর্থিত সংগঠনের ডাকে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় অবরোধকারীদের কিছু স্থানে সশস্ত্র মহড়া দিতে দেখা গেছে ভিডিও ফুটেজে। বেলা ১১টার দিকে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাইল্যাছড়ি এলাকায় মোটরসাইকেলে কয়েকজনকে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায়।
সাজেকে সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে হামলা, লাঠিপেটা ও ঘরবাড়ি-দোকানপাট ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. আমিনুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, সারা জেলায় শান্তিপূর্ণভাবেই অবরোধ পালিত হয়েছে। তবে মাটিরাঙ্গা উপজেলার বাইল্যাছড়ি এলাকায় মোটরসাইকেলে কয়েকজনকে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে অবরোধ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দুপুর ১২টা থেকে দুই জেলায় সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। অবরোধ চলাকালে কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ এবং গাছের গুঁড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন অবরোধকারীরা।
পুলিশ জানায়, অবরোধ চলাকালে খাগড়াছড়ি শহরের চেঙ্গী ব্রিজ ও স্বনির্ভর এলাকা, খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কৃষি গবেষণা এলাকা এবং চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের গুইমারা জোড়াব্রিজ এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের সাপমারা এলাকায় গাছ কেটে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল।
অন্যদিকে রাঙামাটি শহরের বনরূপা ও কল্যাণপুর বাজারসহ অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোয় যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কেও দূরপাল্লার যানবাহন চলেছে। তবে রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে সকাল থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। সাপছড়ি খামারপাড়া ও কুতুকছড়ি ধর্মঘর এলাকায় সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও আগুন জ্বালিয়ে পিকেটিং করেছিলেন অবরোধকারীরা। কুতুকছড়ি হাফ বাজার থেকে ধর্মঘর পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলও বের করা হয়। দুপুর ১২টার পর এ সড়কেও যান চলাচল শুরু হয়েছে।
রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে বলেন, নৌপথে অবরোধের কোনো প্রভাব পড়েনি। লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
কর্মসূচির ডাক দেওয়া ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা বলেন, তাঁদের আহ্বানে ডাকা অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়েছে। ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মসূচি ছিল। সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবি ও অধিকার উপেক্ষা করা হলে এবং তাঁদের ওপর লাঠিপেটা ও গুলিবর্ষণের মতো ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। আপাতত অবরোধ কর্মসূচি শিথিল করা হয়েছে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব বলেন, অবরোধকে কেন্দ্র করে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। কয়েকটি স্থানে অবরোধকারীরা ব্যারিকেড দিয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্মল চাকমার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংগঠন এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির যানবাহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা চাওয়া হয়। অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যান ও সাংবাদিকদের গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
এর আগে গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন তিন দফা দাবিতে সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়। এটি এ দুই সংগঠনের তৃতীয় দফা অবরোধ। সংগঠন দুটির অন্যতম দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু লারমা-সমর্থিত জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।
গত বুধবার সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় সাজেক পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি বন্ধ রাখার কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে পর্যটকদের নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পর্যটকেরা সাজেক ছাড়তে শুরু করেন।
সবশেষে গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে অবরোধে সাজেকের গঙ্গারামস্থ উজুবাজার এলাকায় আটকা পড়ে প্রায় তিন হাজার পর্যটক। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আটকে পড়া ৩ হাজার পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়ি পৌঁছে দেয় সেনাবাহিনী ও পুলিশ।