জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দখলে রাখার মামলায় কক্সবাজারের ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান ইয়াহিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ অনাদায়ে তাঁকে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) চট্টগ্রামের বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে সাজামূলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত।
আনিসুর রহমান ইয়াহিয়া কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ এলাকার মৃত হাজি নবী হোসেনের ছেলে।
দুদকের পক্ষে মামলাটি পরিচালনাকারী আইনজীবী রেজাউল করিম রনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিপুল পরিমাণ সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে না পারায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় আদালত এ সাজা দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারায় তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাঁকে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা ছিলেন। সাক্ষীদের বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে সংগ্রহ করা নথি ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য পেয়েছেন আদালত।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১৯ নভেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আনিসুর রহমান ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের খুলশী থানায় মামলা করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর তৎকালীন সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম।
তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও দখলে রাখার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। একই বছরের ১৭ আগস্ট আদালত অভিযোগপত্র আমলে নেন। পরে ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের খুলশী আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ২৪ নম্বর প্লটে চারতলা বাড়ি, একই এলাকার ৬ নম্বর সড়কের একটি প্লটে সাততলা অ্যাপার্টমেন্ট এবং লালখান বাজারের ৩৩৫ এম এম আলী রোডে দশতলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ ও জমির মূল্য নির্ধারণ করে গণপূর্ত বিভাগ।
নথি অনুযায়ী, খুলশীর চারতলা বাড়িতে জমিসহ বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৬ হাজার ৫৬২ টাকা। সাততলা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ ৪ কোটি ৬৫ লাখ ২০ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং লালখান বাজারের বাণিজ্যিক ভবনে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ৯ হাজার ২৩২ টাকা। তিনটি স্থাপনায় মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ কোটি ২০ লাখ ৬ হাজার ৩৫৩ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৭-০৮ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর নথিতে ইয়াহিয়া জমি ও গৃহসম্পত্তি খাতে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করেছিলেন। তিনটি ভবনে নির্ধারিত মোট বিনিয়োগের সঙ্গে আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদের তুলনা করে ১১ কোটি ২৬ লাখ ৪১ হাজার ৩৫৩ টাকার বিনিয়োগ অপ্রদর্শিত থাকার তথ্য পায় দুদক।
মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, ঢাকার বারিধারায় ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজার সদরে ১৭ লাখ টাকায় ‘আজকের দেশ-বিদেশ’ পত্রিকার কার্যালয় এবং টেকনাফে ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় নাফ ভিউ ফিলিং স্টেশন লিজ নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় জমি ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের তথ্যও উঠে আসে।
অনুসন্ধানে ৬৫ হাজার টাকায় একটি বন্দুক এবং এক লাখ টাকায় একটি পিস্তল কেনার তথ্যও পাওয়া যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
দুদকের অভিযোগ, এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে ১২ কোটি ৫৫ লাখ ১ হাজার ৩৫৩ টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণভাবে অর্জন ও দখলে রাখার অভিযোগ আনা হয় ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে।