চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) অচলাবস্থার প্রায় এক মাস হতে চলল। উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সর্বাত্মক শাটডাউন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে এখনো স্থবির বিশ্ববিদ্যালয়। সংকট নিরসনে সিন্ডিকেট সভা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সংকট নিরসনে কমিটি হয়েছে। তবে সিন্ডিকেট সভায় যেমন চুয়েটের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন না, তেমনি সংকট নিরসন কমিটিতেও রাখা হয়নি চুয়েটের কাউকে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
চুয়েটে অচলাবস্থার সূত্রপাত গত ২১ সেপ্টেম্বর রাতে। ওই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়। দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় আবু সাদাতকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচিতে যুক্ত হন।
এই সংকটের মধ্যে ১২ অক্টোবর সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছাত্রদলের কয়েক নেতা। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁদের প্রশাসনিক ভবনে অবরুদ্ধ করে রাখেন। ওই ভবনে বিদ্যুৎ ও পানি-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে আনা হয়। এরপর তিনি আর ক্যাম্পাসে ফেরেননি। তবে ১৬ অক্টোবর সেখান থেকে অনলাইনে সিন্ডিকেট সভায় সভাপতিত্ব করেন। এরপর থেকে আর দৃশ্যপটে নেই উপাচার্য।
অনড় শিক্ষার্থীরা: ক্যাম্পাসে এখন দুর্গাপূজার ছুটি চলছে। ক্যাম্পাস ফাঁকা। মূল বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। ছুটি শেষে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হবে কি না, স্থগিত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি কবে ঘোষণা করা হবে এবং সেশনজট কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরাও তাঁদের দাবি থেকে সরে আসেননি। এ প্রসঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী আহনাব শাহরিয়ার অর্ণব বলেন, ‘আমাদের দাবি তো একেবারে পরিষ্কার। সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল করতে হবে। আর ক্যাম্পাসে না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীদের কাছে মুচলেকা দিয়েছেন ভিসি (শেখ শরীফুল আলম)। তিনি আর এই দায়িত্বে থাকতে পারবেন না।’
নতুন করে সংকট: শেখ শরীফুল আলমের নেতৃত্ব ১৬ অক্টোবর অনলাইনে অনুষ্ঠিত চুয়েটের সিন্ডিকেট সভা হয়। ১৫ সদস্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ছয়জন। তাঁদের মধ্যে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাড়া চুয়েটের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি ছিলেন না। অর্থাৎ কার্যকর ১৫ সদস্যের মধ্যে অনুপস্থিত ছিলেন ৯ জন, যা মোট সদস্যের ৬০ শতাংশ। ফলে এই সভা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বিতর্কিত এই সভা থেকে চুয়েটের সংকট নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে নিরপেক্ষ ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠনের সুপারিশ পাঠানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ১৮ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে কমিটি গঠনের বিষয়ে জরুরি সুপারিশ চায়। ইউজিসির সদস্য পর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে তদন্ত বা পর্যালোচনা কমিটি গঠন এবং সংকটের বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরপর ১৯ অক্টোবর পাঁচ সদস্যের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ২০ অক্টোবর ওই কমিটিতে আরেকজন অন্তর্ভুক্ত হন। ইউজিসির কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংস্থাটির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের পরিচালক জামিনুর রহমান।
কমিটিতে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুনকে আহ্বায়ক এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসানকে সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কমিটিতে আছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি), চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ) অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারি। তবে যে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সংকট সেই চুয়েটের কেউ নেই। ফলে এই কমিটি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এই বিষয়ে কথা বলতে ভিসি শেখ শরীফুল আলমের দুটি নম্বরে কল করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। এই বিষয়ে চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, ‘চুয়েটের সমস্যা নিরসনে গঠিত কমিটিতে চুয়েটেরই কেউ নেই। এর থেকেও বড় প্রশ্ন হলো, যে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই সভারই বৈধতা কতটুকু? কারণ, ওই সিন্ডিকেট সভাতেও চুয়েটের কেউ ছিলেন না।’