সমতল ভূমিতে বসবাসরত অনগ্রসর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে সরকারের নেওয়া সমন্বিত প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ফটিকছড়িতে ছাগল বিতরণে একের পর এক অনিয়ম ও গুরুতর অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকল্পের মাস্টাররোলে নাম নেই—এমন ব্যক্তিকেও দেওয়া হয়েছে ছাগল। আবার তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের কারও কারও স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ উঠেছে। একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে একাধিক উপকারভোগীর নামে।
শুধু তা-ই নয়, বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা থাকা ছাগল পেতে উপকারভোগীদের কাছ থেকে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। প্রকল্পের কার্যাদেশে উল্লেখ থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বদলে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ উত্তোলনের তথ্যও মিলেছে। ছাগল গ্রহণ কমিটির কার্যক্রম, বিতরণের পর পুনঃ বিতরণ প্রতিবেদন এবং নগদ সহায়তার অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও দেখা দিয়েছে নানা অসংগতি।
দীর্ঘ অনুসন্ধান, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাস্টাররোল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং মাঠপর্যায়ে উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ ফটিকছড়ির খিরাম ইউনিয়নের জঙ্গল মগকাটা গ্রামের কৃষক সুরেশ চাকমা। তাঁর বাবার নাম রবীন্দ্র চাকমা। প্রকল্পের মাস্টাররোল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে সুরেশ চাকমার নাম নেই। অথচ প্রকল্পের আওতায় তিনি দুটি ছাগল পেয়েছেন।
সুরেশ চাকমা বলেন, তিনি কোনো কাগজে স্বাক্ষর করেননি। প্রকল্পের ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর ও ওই এলাকার বাসিন্দা দীপঙ্কর চাকমার কাছে অর্থের বিনিময়ে তিনি ছাগল দুটি পেয়েছেন।
সরকারি মাস্টাররোলে নাম না থাকা সত্ত্বেও সুরেশ চাকমার হাতে কোন নিয়মে প্রকল্পের দুটি ছাগল পৌঁছাল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
একই এলাকার শোভা চাকমার নাম ও মোবাইল নম্বর রয়েছে প্রকল্পের মাস্টাররোলে। কিন্তু সেখানে থাকা স্বাক্ষরটি তাঁর নয় বলে দাবি করেছেন শোভা চাকমা।
নথিতে তাঁর নামে ছাগলের পাশাপাশি অন্যান্য সামগ্রী পাওয়ার তথ্যও রয়েছে। তবে শোভা চাকমার দাবি, তিনি এসব সামগ্রীর কিছুই পাননি। বিতরণের পর তাঁর পাওয়া দুটি ছাগলও মারা গেছে।
একই ধরনের অভিযোগ জীবন পুরন চাকমার ক্ষেত্রেও। মাস্টাররোলে তাঁর নাম থাকলেও সেখানে থাকা স্বাক্ষর তাঁর নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।
জীবন পুরন চাকমা বলেন, ‘কোনো মাস্টাররোলে আমি স্বাক্ষর করিনি।’ তবে ছাগল পেতে দীপঙ্কর চাকমাকে দিতে হয়েছে এক হাজার টাকা।
মাস্টাররোলে থাকা স্বাক্ষরগুলো প্রকৃত উপকারভোগীদের স্বাক্ষরের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি। কারা এসব স্বাক্ষর করেছেন, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
মাস্টাররোলে আরও একটি অসংগতি পাওয়া গেছে। খিরাম ইউনিয়নের তালিকার ১ ও ২ নম্বর ক্রমিকের উপকারভোগীদের নামে একই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নম্বরটি প্রকল্পের মাঠকর্মী দীপঙ্কর চাকমার বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ১১ ও ১৩ নম্বর এবং ২০ ও ২১ নম্বর ক্রমিকেও একই মোবাইল নম্বর ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
একই মোবাইল নম্বর একাধিক উপকারভোগীর নামে কেন ব্যবহার করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নথিতে পাওয়া যায়নি।
তবে প্রকল্পের মাঠকর্মী দীপঙ্কর চাকমা বলেন, ‘অনেকেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাই তাঁদের ক্ষেত্রে একই মোবাইল নম্বর একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে।’
প্রকল্পের আওতায় ছাগল বিনা মূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও খিরাম ইউনিয়নের উপকারভোগীদের কাছ থেকে ছাগল দেওয়ার সময় ৮০০ থেকে ১ হাজার এবং কোথাও ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপকারভোগীদের কয়েকজন জানান, অধিকাংশের কাছ থেকেই এ অর্থ নিয়েছেন প্রকল্পের মাঠকর্মী দীপঙ্কর চাকমা।
অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করে দীপঙ্কর চাকমা বলেন, ছাগল পরিবহনের জন্য গাড়িভাড়া বাবদ এসব টাকা নেওয়া হয়েছে।
তবে এই টাকা নেওয়ার কোনো সরকারি অনুমোদন ছিল কি না, থাকলে কোন খাতে নেওয়া হয়েছে এবং অর্থ গ্রহণের বিপরীতে কোনো রসিদ দেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী ছাগল বিতরণের পর মারা গেলে সে-সংক্রান্ত পুনঃ বিতরণ প্রতিবেদন দাখিল করার কথা থাকলেও ফটিকছড়িতে এমন প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ফলে সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী কতটি ছাগল গ্রহণ করা হয়েছিল, কতটি বিতরণ করা হয়েছে, কারা পেয়েছেন এবং বিতরণের সময় কারা উপস্থিত ছিলেন—এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পের ছাগল গ্রহণের জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও ভেটেরিনারি সার্জনকে সদস্য করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ ছাগল গ্রহণের বিষয়ে অবহিত ছিলেন না। এমনকি ছাগল গ্রহণের সময়ও তাঁরা উপস্থিত ছিলেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মমিনের অনুমতি নিয়ে প্রকল্পের মাঠকর্মী তোয়াইনিং মার্মা ও দীপঙ্কর চাকমা ছাগলগুলো গ্রহণ করেন। পরে তাঁরা নির্ধারিত কয়েকটি স্থানে এসব ছাগল বিতরণ করেন।
মাঠকর্মী ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার একান্ত সহকারী পরিচয় দেওয়া তোয়াইনিং মার্মা বলেন, ‘ঠিকাদার ভোর হওয়ার আগেই ছাগলগুলো নিয়ে আসেন। তখন স্যাররা থাকেন না। আমি ও দীপঙ্কর চাকমা মিলে ছাগলগুলো গ্রহণ করে উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করে দিই।’
অথচ ছাগল বিতরণের আগে ছাগলগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকাদান করার কথা সংশ্লিষ্ট পরিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। এসব কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জনের।
তবে ছাগল বিতরণের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন জাহাঙ্গীর মাহমুদ রাকিব। তিনি বলেন, ‘ছাগল বিতরণের বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। ছাগলগুলোকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়েও আমার জানা নেই। তবে যতটুকু জানি, ছাগল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরই ভ্যাকসিন দিয়ে ছাগল বিতরণের কথা।’
প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের কার্যাদেশ ও পরিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে মেসার্স তুষার এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স লুৎফা এন্টারপ্রাইজের নাম রয়েছে।
কিন্তু ট্রেজারি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ‘দুর্বার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করেছে।
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের স্মারক নম্বর ২৬/৯২৬-এর বিপরীতে অর্থ উত্তোলনের অনুমোদনকারী কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিনের নাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এ কে এম নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের এত কিছু পর্যালোচনা করার সুযোগ নেই। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা যাঁকে অনুমোদন দেন, তাঁর ভিত্তিতেই আমরা অর্থ ছাড় করে থাকি।’
কার্যাদেশে উল্লেখ থাকা দুটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের নামে কীভাবে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হলো, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া কার্যাদেশে থাকা তুষার এন্টারপ্রাইজ বা লুৎফা এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে দুর্বার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের কোনো অনুমোদিত সম্পর্ক, প্রতিনিধি নিয়োগ কিংবা চুক্তিগত সংযোগ রয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেও তার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
নগদ সহায়তার ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরত
প্রকল্পের প্রথম ধাপে উপকারভোগীদের নগদ সহায়তা হিসেবে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে পাওয়া গেছে। তবে ওই অর্থ উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ না করে প্রকল্পের তহবিলে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
কেন অর্থ বিতরণ করা হয়নি, কার সিদ্ধান্তে তা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে—এসব বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে প্রকল্পের মাঠকর্মী তোয়াইনিং মার্মা বলেন, ‘জেলা থেকে ওই অর্থ আমাদের ফান্ডে আসেনি।’ এ বক্তব্যের সময় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবদুল মমিন কোনো আপত্তি জানাননি।
‘কিছু ভায়োলেশন হয়েছে’: প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মমিন বলেন, প্রকল্পের সব উপকরণ ও অর্থ উপকারভোগীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে এসব বিষয়ে কিছু ‘ভায়োলেশন’ হয়েছে বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘মূলত সময়মতো পরিপত্র হাতে না পাওয়ায় এ ধরনের ভায়োলেশন হয়েছে।’
ছাগল মারা যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি সরকারের এ প্রকল্পটিকে ‘লস প্রজেক্ট’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
এর আগে প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলমকে প্রধান করে দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।
তবে কমিটি গঠনের কয়েক দিন পরই তাঁকে সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার, সিলেটের উপপরিচালক হিসেবে বদলি করা হয়।
ফলে তদন্ত কত দূর এগিয়েছে, বর্তমানে তদন্ত কার্যক্রম কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কমিটির প্রধান বদলি হওয়ার পর তদন্ত কীভাবে সম্পন্ন হবে—এসব বিষয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
তবে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত প্রতিবেদন সঠিক ও গ্রহণযোগ্য না হলে নতুন করে কমিটি গঠন করে কেন্দ্র থেকে তদন্ত দল পাঠানো হতে পারে। প্রকল্পের অর্থ ও উপকরণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সমন্বয়ক জুনিয়া ত্রিপুরা বলেন, ‘কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড সরকারের এই মহৎ উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমরা চাই, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
প্রকল্প পরিচালক ড. অসীম কুমার দাশ বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার উচিত ছিল ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। সমন্বয়ের ঘাটতিকে তিনি ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থ গ্রহণে অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হবে।