অর্ডার বাতিলের লোকসান, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের বাইরে অতিরিক্ত চার্জ, জটিল হিসাব, একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অনলাইনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডার বিরুদ্ধে। রেস্তোরাঁর মালিকদের অভিযোগ, বিক্রির টাকা পেতেও ১৩ দিন বা তার বেশি সময় লাগছে। এতে বাড়ছে ব্যবসার খরচ, কমছে মুনাফা। ফুডপান্ডার এসব একতরফা ও অস্বচ্ছ নীতির প্রতিবাদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁর মালিকেরা। একই সঙ্গে তাঁদের দাবি না মানলে ফুডপান্ডার মাধ্যমে অর্ডার গ্রহণ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন নওশাদ ও সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল হক বক্তব্য দেন। এ সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন রেস্তোরাঁর মালিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁর মালিকেরা বলেন, তাঁরা প্রযুক্তির বিরোধী নন; বরং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা চান। কিন্তু ফুডপান্ডার বর্তমান নীতির কারণে রেস্তোরাঁর মালিকদের ওপর একের পর এক আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এতে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁর কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের ওপরও।
রেস্তোরাঁর মালিকদের অভিযোগ, ফুডপান্ডার সঙ্গে চুক্তিতে নির্ধারিত কমিশনের বাইরেও অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, অপেক্ষার মাশুল, কমিশনের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), ট্যাব ফি ও ইন্টারনেট ফিসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। ফলে কাগজে-কলমে বিক্রির পরিমাণ ভালো দেখালেও সব খরচ বাদ দিয়ে হাতে থাকে সামান্য অর্থ। এসব চার্জের বিস্তারিত হিসাবও সহজে বোঝা যায় না বলে দাবি তাঁদের।
তাঁদের ভাষ্য, মাস শেষে ফুডপান্ডার পাঠানো হিসাব এতটাই জটিল যে, কোন খাতে কত টাকা কাটা হয়েছে, তা বুঝতে হিমশিম খেতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ কর্তনের কারণ ও সংশ্লিষ্ট খাত সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় না। এতে নিজেদের বিক্রি, কমিশন ও প্রকৃত আয় যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রেস্তোরাঁর মালিকেরা আরও অভিযোগ করেন, ফুডপান্ডার প্রযুক্তিগত সমস্যা কিংবা খাবার সরবরাহ ব্যবস্থাপনার জটিলতায় অর্ডার বাতিল হলেও এর আর্থিক দায় নিতে হয় তাঁদের। একটি অর্ডার পাওয়ার পর খাবার তৈরিতে কাঁচামাল, শ্রম ও সময় ব্যয় হয়। কিন্তু খাবার তৈরি হয়ে যাওয়ার পর অর্ডার বাতিল হলে সেই খাবার অন্য গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা সব সময় সম্ভব হয় না। ফলে খাবারের পুরো খরচই লোকসানে পরিণত হতে পারে।
তাঁদের দাবি, সরবরাহকর্মী বা রাইডার দেরিতে খাবার সংগ্রহ করায় গ্রাহক অর্ডার বাতিল করলেও রেস্তোরাঁকে জরিমানা বা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। যে বিলম্বের জন্য রেস্তোরাঁ দায়ী নয়, তার দায় কেন মালিকদের নিতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তাঁরা।
গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রেও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন রেস্তোরাঁর মালিকেরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে এবং রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না শুনেই পাওনা টাকা থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হয়। এতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন ব্যবসায়ীরা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফুডপান্ডার মাধ্যমে বিক্রি হওয়া খাবারের টাকা পেতে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লাগে। অথচ রেস্তোরাঁ পরিচালনায় প্রতিদিন কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া, কাঁচামাল কেনা ও বিদ্যুৎ বিলসহ নানা খরচ মেটাতে হয়। বিক্রির টাকা দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় চলতি মূলধনের সংকট তৈরি হয়, যা নিয়মিত ব্যয় নির্বাহকে কঠিন করে তোলে।
রেস্তোরাঁর মালিকদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিক্রি বাড়লেও অতিরিক্ত চার্জ ও নানা ধরনের কর্তনের কারণে প্রকৃত মুনাফা কমে যাচ্ছে। ফলে বিক্রি বাড়ার সুফল তাঁরা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে খাবারের মান বজায় রাখা, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যয় বহনের দায়িত্ব তাঁদেরই নিতে হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় খাবার সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ফুডির উদাহরণ তুলে ধরে রেস্তোরাঁর মালিকেরা বলেন, দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশনে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারলে ফুডপান্ডার ক্ষেত্রে কমিশনের বাইরে এত ধরনের চার্জ কেন থাকবে? তাঁদের দাবি, সব ধরনের চার্জ কমিশনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ সমন্বিত কমিশন নির্ধারণ করতে হবে।
রেস্তোরাঁর মালিকদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—কমিশনের বাইরে সব ধরনের অতিরিক্ত চার্জ বাতিল, সহজ ও স্বচ্ছ খাতওয়ারি হিসাব প্রদান, রেস্তোরাঁর দায় ছাড়া অর্ডার বাতিল হলে খাবারের সম্পূর্ণ খরচ বহন, রাইডারের বিলম্বের কারণে জরিমানা বন্ধ, অভিযোগ যাচাই ও রেস্তোরাঁর বক্তব্য না শুনে অর্থ কর্তন বন্ধ এবং সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে বিক্রির টাকা পরিশোধ।
সমিতির নেতারা জানান, ফুডপান্ডা কর্তৃপক্ষ তাঁদের দাবিগুলো মেনে না নিলে চট্টগ্রাম মহানগরের রেস্তোরাঁর মালিকেরা সম্মিলিতভাবে এই প্ল্যাটফর্মে অর্ডার গ্রহণ স্থগিত বা সম্পূর্ণ বন্ধ করার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন। এতে ফুডপান্ডার পাশাপাশি অনলাইন অর্ডারের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহকেরাও প্রভাবিত হতে পারেন।
একই সঙ্গে অনলাইনে খাবার সরবরাহ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন রেস্তোরাঁর মালিকেরা। এ খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।