চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রোডাকশন ওয়ারেন্টকে (কারাগারে থাকা আসামিকে আদালতে হাজির করার পরোয়ানা) ভুলবশত জামিননামা মনে করে এক আসামিকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার ১০ দিন পর গত শুক্রবার রাতে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।
জানা গেছে, মো. রুবেল ওরফে রবি (৩৫) নামের ওই আসামিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৫৮ মিনিটে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। এর আগে ২০ আগস্ট নগরের সদরঘাট থানায় করা একটি মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাবন্দী অবস্থায় সদরঘাট থানায় তাঁর বিরুদ্ধে আগে করা আরও দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এ ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত কারাগার থেকে কোনো আসামিকে মুক্তির আগে একাধিক স্তরে (ওয়ার্ড মাস্টার, ডেপুটি জেলার ও সিনিয়র জেল সুপার) নথিপত্র যাচাই করার কথা। কোনো স্তরেই ভুল ধরা না পড়া বড় ধরনের প্রশাসনিক গাফিলতি।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, যাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আনা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি তাঁরা খুঁজে বের করেছেন। দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এখানে নতুন এসেছেন। ফরমগুলো দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় ভুল হয়েছে। মানুষ মাত্রই ভুল করে।’
চট্টগ্রামের আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান বলেন, কারাগারের কার্যক্রম এখন ডিজিটালাইজড। অনলাইন ডেটাবেইসে আসামির জামিন ও ওয়ারেন্ট-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়। এ অবস্থায় এ ধরনের ভুল গুরুতর বিষয়। কাজের চাপের কারণে এমন ভুল হতে পারে, তবে এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
জিয়া হাবীব বলেন, ‘এটা আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারত। মুক্তি পাওয়া আসামি যদি চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা খুনের মামলার আসামি হতেন, তাহলে কী হতো? ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকতেন বা নতুন করে বড় কোনো অপরাধ সংঘটিত হতে পারত।’
কারাগারে থাকা অবস্থায় রুবেলের বিরুদ্ধে থাকা তিন মামলার মধ্যে দুটিতে সম্প্রতি আদালত তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। অন্য একটি মামলায় তাঁকে আদালতে হাজির করার জন্য প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। এর মধ্যে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
ঘটনা জানাজানির পর কারা কর্তৃপক্ষ থেকে নগরের কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করা হয়। বাদী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেল সুপার মো. ইব্রাহিম। এজাহারে বলা হয়, দুই মামলার জামিননামা যাচাইয়ের জন্য ওই দিন রুবেলকে কারাগারের মূল ফটকে আনা হয়েছিল। কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় তিনি কৌশল ও চালাকির আশ্রয় নিয়ে ফটক থেকে পালিয়ে যান। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
তবে কারা গোয়েন্দা সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। সূত্র জানায়, ঘটনার দিন কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় রুবেলের একটি মামলার প্রোডাকশন ওয়ারেন্টকে জামিননামা মনে করে কারা রেজিস্ট্রার খাতা থেকে তাঁর নাম কেটে দেওয়া হয়। রেজিস্ট্রারের সেই তথ্য অনলাইনে ইনপুট দেওয়া হয়। ওই দিন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা ডেপুটি জেল সুপার ইব্রাহিম রেজিস্ট্রারের তথ্য দেখে আসামিদের মুক্তির অনুমোদন দেন। এরপর রুবেল মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসেন। পরে তিনি তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং আত্মগোপনে চলে যান।
ডেপুটি জেল সুপার ইব্রাহিমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন বলে জানান।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল কবির বলেন, কারা কর্তৃপক্ষের করা মামলায় শুক্রবার রাতে সদরঘাট থানার পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকা থেকে রুবেলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল পুলিশকে জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তিনি মনে করেছিলেন তাঁর সব মামলায় জামিন হয়ে গেছে। এরপর ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর তিনি কারাগারের ফটক দিয়ে বের হয়ে যান।
রুবেল রাজবাড়ী সদর উপজেলার কেরচা চৌধুরীবাড়ি এলাকার মো. হাসানের ছেলে। নগরে তাঁর পরিবার সদরঘাট থানার রেলবিট এলাকায় বসবাস করে।