হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

ওয়াসার জমি দখল করা ব্যক্তিই চেয়ারম্যান

সবুর শুভ, চট্টগ্রাম    

ইদ্রিস মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

আইন অনুযায়ী, ওয়াসা বোর্ডের সদস্যের বাইরে কেউ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হতে পারবেন না। তবে এই আইনের তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপি নেতা ইদ্রিস মিয়া। ওয়াসার জমি বন্ধ রেখে ২২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ইদ্রিস মিয়ার বিরুদ্ধে। এই জমির মালিকানা নিয়েও এখনো দ্বন্দ্ব রয়েছে ওয়াসার সঙ্গে। এস আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত তিনি। এমন বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইদ্রিস মিয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। এর আগে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পটিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খাতুনগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের (পানি সরবরাহ-৩ শাখা) সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী গত ১৭ সেপ্টেম্বর ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে ৩ বছর মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী তাঁকে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, বোর্ডের একজন চেয়ারম্যান থাকবেন, যিনি সরকার কর্তৃক সদস্যদের (ওয়াসা বোর্ড) মধ্য হতে নিযুক্ত হবেন। কিন্তু ইদ্রিস মিয়া ওয়াসা বোর্ডের সদস্য নন। ফলে এই নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়াসার জমি দখল

ওয়াসা সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের মধ্য হালিশহরে ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে মধ্য হালিশহরের ৯৫৭ শতক বা ৯ দশমিক ৫৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এই জমির প্রায় ১০ একর জমি ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকা ঋণ নেয় মেসার্স আজমির ট্রেডিং। যার মালিক ইদ্রিস মিয়া। সেই ২২ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেয়। বিষয়টি নজরে এলে ২৯ নভেম্বর ওয়াসার তৎকালীন সচিব শারমিন আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপককে চিঠি দেন।

ওয়াসার পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, জাল দলিল তৈরি করে একটি চক্র জমিটি আত্মসাতের চেষ্টা করছে। ওয়াসার নথি অনুযায়ী, এ জমি নিয়ে এর আগেও ২০০৬ ও ২০১১ সালে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা হয় উল্লিখিত জমি। বর্তমানে উল্লিখিত স্থানে ওয়াসার ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, যে মামলার প্রেক্ষিতে জায়গাটি অন্যজনের বলা হচ্ছে, সেই মামলার আদেশের বিরুদ্ধে ওয়াসার পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া বলছেন, ‘সালমা বেগমের সঙ্গে রেজিস্টার্ড বায়না করার পর ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছি। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। এ কারণে আদালতে মামলা চলছে।’

ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ওয়াসার অধিগ্রহণ করা জমি কীভাবে আরেকজনের হয়? এটি একপ্রকার অসম্ভব। দীর্ঘদিন জায়গাটি পড়ে থাকার কারণে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে নামজারি খতিয়ান সৃজন করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা।

এস আলম বিতর্ক

ইদ্রিস মিয়ার বাড়ি পটিয়ায়। বহুল আলোচিত সাইফুল আলম মাসুদ বা এস আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও পরিচিত তিনি। এস আলমের ৮ কোটি টাকা অর্থায়নে পটিয়ায় নির্মিত আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ নামের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি তিনি। জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া ইউনিয়ন ব্যাংকটিও এস আলমের মালিকানাধীন ছিল। ফলে এস আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবেও তিনি পরিচিত। ১৭ সেপ্টেম্বর এই নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিতর্কটি আবারও সামনে এসেছে। তবে ইদ্রিস মিয়া এখনো ওয়াসায় যাচ্ছেন না। এই বিষয়ে জানতে চাইলে ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘একটু ব্যস্ত আছি।’