হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে

 আবু বকর ছিদ্দিক, চট্টগ্রাম

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দরের সব কনটেইনার টার্মিনাল একে একে চলে যাচ্ছে বিদেশি অপারেটরদের হাতে। চারটি টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইতিমধ্যে দেওয়া বা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এখন চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল—এই তিনটিতেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে।

পতেঙ্গা, লালদিয়ার চর ও পানগাঁও আইসিডি—এই তিন টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ আগেই দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার উচ্চপর্যায়ের সভায় আলোচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে টার্মিনালগুলো হস্তান্তরের তীব্র বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলো নতুন করে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। বন্দর, কাস্টমস ও প্রেসক্লাব এলাকায় শ্রমিক-কর্মচারীরা একের পর এক কর্মসূচি নিচ্ছেন।

নৌপরিবহনসচিব জাকারিয়া গত শুক্রবার মোবাইল ফোনে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ সরকারের নিয়মিত কাজ। সরকার ইতিমধ্যে তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ দিয়েছে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপারেশনে চলে গেছে। ডিসেম্বরে পানগাঁও আইসিডি পুরোদমে অপারেশনে যাবে। এখন আরও তিনটি টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

নৌপরিবহনসচিব বলেন, বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালিত হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের সক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকেরা আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাবে।

তবে সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে শ্রমিক নেতারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন।

১৫ বছরের জন্য এনসিটি

গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পিপিপির আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের কাছে দেওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদন করে সরকার। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প প্রোফাইলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মনোনীত অপারেটর হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। কমিটির বৈঠকে স্বাক্ষরিতব্য কনসেশন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করা হয়।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪% করেছে এনসিটি। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে এটি এককভাবে সবচেয়ে বড় টার্মিনাল।

তিনটির বিষয়ে আগ্রহী সৌদি প্রতিষ্ঠান

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল (আরএসজিটিআই) ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনাল পরিচালনা করতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে আরএসজিটিআইকে টার্মিনাল তিনটির অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে বন্দর সচিব সৈয়দ কেফায়েত হামিম বলেন, ‘এগুলো যেহেতু সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যাপার, তাই আমি কোনো মন্তব্য করছি না।’

ইউনূস সরকারের এক দিনে দুই চুক্তি

এর আগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর এক দিনেই লালদিয়ার চর ও পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও টার্মিনালের বার্ষিক হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টিইইউয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের চাহিদা মেটাতে মেডলগ টার্মিনালের সুবিধা বাড়াবে।

ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসকে ৪৮ বছরের কথা মাথায় রেখে নিয়োগ দেওয়া হয়। এপিএম ২০৩০ থেকে পরবর্তী ৩০ বছরের জন্য টার্মিনালটি চালাবে। মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর নবনির্মিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার কাজ ২২ বছরের জন্য রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনালকে (আরএসজিটিআই) দিতে চুক্তি সই হয়।

শ্রমিক-কর্মচারী নেতাদের ভিন্নমত

মূলত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলে আসছে সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন শ্রমিক-কর্মচারী নেতারা।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন গতকাল শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, বন্দরের টার্মিনালগুলোতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃত্ব হারাবে। জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে।

একই বিষয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, ‘বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ হলে বন্দর দেউলিয়া হয়ে যাবে। শ্রমিকেরা চাকরি হারাবে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদনের পরও বন্দর রক্ষা কমিটি এর তীব্র বিরোধিতা করে।

প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা

বন্দর রক্ষা কমিটি গতকাল শনিবার এনসিটি ও এর ওসিওয়াই আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে দিতে চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল এবং চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, এনসিটিকে ১৫ বছরের জন্য কনসেশনে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্তের আগে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এর পরিচালনার সম্ভাব্য আয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কনসেশনে দিলে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

বন্দর রক্ষা কমিটি বলেছে, জাতীয় কৌশলগত অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব, কর্মসংস্থান, শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতা যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ফজলুল কবির মিন্টু আরও বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সময়ে এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনে দেওয়ার ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়োর প্রয়োজন কেন—তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা দরকার।

বন্দর রক্ষা কমিটি এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ডের প্রস্তাবিত চুক্তির প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল, সিসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠি প্রত্যাহার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বন্দর শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে করা ‘হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, আগামীকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান গেটে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বন্দর রক্ষা কমিটি। এর মধ্যে সরকার এনসিটি ও সিসিটি ইজারা প্রদানের উদ্যোগ বাতিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিলে অবস্থান কর্মসূচি থেকে বৃহত্তর আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিইউসি, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশন, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), জাতীয়তাবাদী ডক শ্রমিক দল, বিএফটিইউসি, জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

‘প্রাণ দেব, এনসিটি তুলে দেব না’

এদিকে সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দর কলোনি এলাকায় আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বন্দর শ্রমিক নেতারা। চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এ সমাবেশের আয়োজন করে।

চট্টগ্রাম বন্দর বিএনপিপন্থী শ্রমিক দলের নেতা নুরুল আজিম বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে চাই, চাকরির কথা তো দূরের বিষয়, আমাদের জীবন গেলেও আমরা এনসিটি কারও হাতে তুলে দেব না।’

নুরুল আজিম বন্দর নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন সরকারের প্রতি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের আস্থা আছে। আমরা তাঁকে বলতে চাই, একটু তথ্য সংগ্রহ করে দেখুন, বিশ্বে এমন কোনো বন্দর আছে কি না, যেখানে শতভাগ বিদেশি কোনো কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

খোকন বলেন, আলোচনার পথ খোলার জন্য সরকারকে পাঁচ দিন সময় দিতে চান তাঁরা। ৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে মশাল মিছিলের ঘোষণা দেন তিনি। এ ছাড়া আগামীকাল চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিপরীতে বন্দর রক্ষা কমিটি এবং আজ প্রেসক্লাবের সামনে সর্বদলীয় শ্রমিক-কর্মচারী প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনেও বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান এ নেতা।