হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

এসআরবি পরিচয়ে অপহরণ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম

ব্যবসায়ীকে অপহরণে জড়িত গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপহরণের শিকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে কক্সবাজারের টেকনাফে লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

পুলিশের দাবি, চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন সুমন মুন্সি। এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন তিনি। চক্রের অন্য সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সরবরাহ করতেন। পরে অপহৃত ব্যক্তিদের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করা হতো।

যেভাবে অপহরণ করা হয় ব্যবসায়ীকে

পুলিশ জানায়, ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে বসেছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। এ সময় কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা জ্যাকেট, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা চার ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন।

ওই ব্যক্তিরা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দেন। পরে হাসান নিজের পরিচয় দিলে তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর তাঁকে টানাহেঁচড়া করে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিভিন্ন যানবাহন পরিবর্তন করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নেওয়া হয়।

অপহরণের পর ওই দিন রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে হাসানের স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। ফোনে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হাসানকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় হাসানের ভাই মো. হোছাইনের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। এরপর পুলিশ হাসানকে উদ্ধারে তৎপর হয়।

চোখ-হাত বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ

উদ্ধারের পর সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসান জানান, অপহরণকারীরা তাঁকে কয়েকটি গাড়ি পরিবর্তন করে একটি বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখে। এ সময় তাঁর পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে কথা বললে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য গলায় ছুরি ধরেও ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

হাসান বলেন, অপহরণকারীরা তাঁকে মারধর করে পরিবারের কাছে টাকা চাওয়ার জন্য চাপ দেয়। একপর্যায়ে দোকানের ব্যবস্থাপককে ফোন করে তাঁর স্ত্রীর কাছে টাকা জোগাড়ের ব্যবস্থা করতে বলেন। তাঁর দাবি, পাঁচ দিনের মধ্যে তাঁকে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়েছিল।

হাসান আরও জানান, দুই দিন পর রাতে তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে অন্য একটি বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর চোখ ও হাত-পা বেঁধে মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়। পায়ে শিকল বেঁধে তাঁকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্তের পর উদ্ধার অভিযান ও গ্রেপ্তার

অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে মাঠে নামে ডিবি ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ। সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গতকাল বুধবার ভোর ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।

অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন, গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।

পুলিশ সুপার জানান, ব্যবসায়ী হাসানকে নিয়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও দোকানের ম্যানেজারকে ফোন দিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। যেসব নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছিল সেগুলো পরীক্ষা করে পুলিশ দেখতে পায় সবগুলো ভিওআইপি নম্বর। ভিওআইপি নম্বর হওয়ায় সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করতে পারছিল না পুলিশ। পরে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে কক্সবাজার পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সিসি টিভি ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা করা হয়। এসআরবি পরিচয়দানকারী চার ব্যক্তি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ব্যবসায়ী হাসানের দোকানে আসে। তাঁকে নিয়ে ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে কিছুটা পথ গিয়ে একটা মাইক্রোবাসে ওঠে। এসব ফুটেজ দেখে ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ করে বলা হয়, সিসিটিভির ভিডিওতে অপহরণকারীদের শনাক্তের পর কক্সবাজার থেকে উখিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রথম জয়নাল উদ্দিন জুনু নামের একজনকে আটক করে পুলিশ। এরপর ফাঁদ পেতে এই ঘটনার হোতা সুমন মুন্সিসহ অন্যদের ধরা হয় কক্সবাজার থেকে। তারা একটা প্রাইভেট কারে ছিল। অভিযানে অপহরণের কাজে ব্যবহৃত সেই প্রাইভেট কারটি জব্দ করার পাশাপাশি কালো রঙের এসআরবি লেখা পাঁচটি জ্যাকেট, এসআরবির দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হাতকড়া জব্দ করেছে পুলিশ।

মাসুদ বলেন, গ্রেপ্তার হওয়াদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অপহৃত ব্যবসায়ী হাসান টেকনাফের লেদায় ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাইরে থেকে গিয়ে অভিযান পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আটক হওয়াদের টেকনাফে নিয়ে যান তাঁরা। তাদেরকে দিয়ে ক্যাম্পে যারা অবস্থান করছিল ব্যবসায়ী হাসানের সঙ্গে তাদেরকে ফোন করানো হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, তাদের দিয়ে ফোনে বলাই যে, ‘মুক্তিপণের টাকা সব পেয়েছি এবং ভিকটিমকে এখন ফেরত দিতে চাই, তোমরা তাকে বের করে নিয়ে আস। আমরা গেইটে অবস্থান করছি।’ নিয়ে আসার পরে হাসানকে আমাদের (পুলিশের) মাইক্রোতে উঠানো হয়। তখন তাঁর মুখ-চোখ বাঁধা ছিল।’

চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন চাকরিচ্যুত সেনাসদস্য সুমন মুন্সি

পুলিশ জানায়, চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি। সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সরবরাহ এবং অপহরণের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনায় অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

এই বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, সুমন মুন্সি আগে উখিয়া এলাকায় র‍্যাবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়া ও কারাভোগের পর তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে এসআরবি পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর সুমন ও তাঁর সহযোগীরা ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন।

পুলিশ সুপার আরও জানান, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা রয়েছে। ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।

পুলিশের দাবি, চক্রটি কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, বান্দরবান ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে সক্রিয় ছিল। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

সন্দ্বীপে যুবদল নেতার নেতৃত্বে ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে জখম

ইউপি নির্বাচনে তৃণমূলকে প্রাধান্য দেবেন তারেক রহমান: সরোয়ার আলমগীর

নিজ বাসা থেকে সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

পটিয়ায় চিনি ছিনতাই: বান্দরবানে উদ্ধার ১৪৪ বস্তা

সীতাকুণ্ডে বাসচাপায় পথচারী নিহত

সিডিপিএল প্রকল্প: পাইপলাইনে মিলছে সুফল, বাধা জনবলসংকট

ফটিকছড়িতে লোকালয় থেকে অজগর উদ্ধার, বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে অবমুক্ত

হিন্দু তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ২

তিন ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ল পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, স্টেশনে যাত্রীদের বিক্ষোভ

ফেসবুকে ছিনতাইয়ের মোটরসাইকেল বিক্রির চেষ্টা, কনস্টেবলসহ গ্রেপ্তার ৪