চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ও চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণ অনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। সেই সঙ্গে ১৯ অক্টোবর আমরণ গণ অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
আজ সোমবার চট্টগ্রাম নগরের কাস্টমস ভবনের বিপরীতে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এ কর্মসূচি চলে।
‘বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ এবং ‘জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দল’-এর যৌথ উদ্যোগে কর্মসূচিটি পালিত হয়। এতে বন্দর রক্ষা কমিটির শীর্ষ নেতা, শ্রমিক নেতা ও সাধারণ কর্মচারীরা অংশ নেন।
সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের দাবি, গত ৮ অক্টোবর জনমত উপেক্ষা করে এবং বন্দর ব্যবহারকারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতি, ভৌগোলিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। বন্দর আধুনিকায়ন ও দুর্নীতিমুক্ত করার কথা বলা হলেও এ উদ্যোগ বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার কৌশল বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার পর বন্দরে কর্মরত দুই শতাধিক কর্মচারীর কাজের ধরন ও চাকরির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই। বন্দর পরিচালনায় শ্রমিকদের অবদানের কথা উল্লেখ করে তাঁদের জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান বক্তারা।
আন্দোলনকারীরা বলেন, কোনো অজুহাতেই চট্টগ্রাম বন্দরের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া যাবে না। বর্তমান কাঠামোতে অথবা দক্ষ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় বন্দর পরিচালনার দাবি জানান তাঁরা।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘গোপনীয়তা চুক্তির আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্পর্কে সরকার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। সরকার কোন যুক্তিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা আমরা জানি না। এটি একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কীভাবে বন্দরের আধুনিকায়ন হবে, সরকার তা ব্যাখ্যা করেনি।’
বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দিলে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থার জটিলতা কীভাবে দূর হবে, সে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বিনিয়োগকারীদের প্রতিও আহ্বান জানান ইব্রাহিম খোকন।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘দেশের লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন করতে চাইলে সড়কের যানজট, কাস্টমসের পণ্য খালাস এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কী করা হচ্ছে? এসব প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ আমরা দেখিনি।’
বন্দর দিয়ে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর সময়ের সঙ্গে আমদানি করা পণ্য কাস্টমস থেকে খালাসে প্রয়োজনীয় সময় এক করে দেখার বিরোধিতা করেন ইব্রাহিম খোকন। তাঁর ভাষ্য, এক হাজার থেকে তিন হাজার কনটেইনারবাহী একটি জাহাজের পণ্য ওঠানো-নামানো এবং নতুন কনটেইনার বোঝাই করে বন্দর ছেড়ে যেতে সাধারণত প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাগে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে জোয়ার-ভাটার প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন ইব্রাহিম খোকন। তাঁর মতে, বন্দরের পরিচালন সক্ষমতা থাকলেও জোয়ার-ভাটার কারণে জাহাজের প্রবেশ ও প্রস্থান সব সময় ইচ্ছামতো করা সম্ভব নয়।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চাহিদা পূরণ করে; এটি বড় কোনো ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র নয়। শুধু টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে দেশের লজিস্টিকস খাতের সব সীমাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যদি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা জাহাজ চলাচলনির্ভর কার্যক্রম গড়ে তুলতে চান, তাহলে বঙ্গোপসাগর উপকূলের এমন স্থান বিবেচনা করতে পারেন, যেখানে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।’
ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দিলে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা কীভাবে বাড়বে এবং জাতীয় অর্থনীতি কীভাবে লাভবান হবে, সে বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেন ইব্রাহিম খোকন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা করা হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং পরিচালন দক্ষতার উন্নতি ঘটবে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের টার্মিনাল পরিচালনার পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার কথা রয়েছে।
তবে বন্দর শ্রমিক ও বিভিন্ন অংশীজন এ উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা, চুক্তির স্বচ্ছতা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রভাব নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।