হোম > সারা দেশ > চট্টগ্রাম

চুয়েটে বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন দপ্তরে অবরুদ্ধ নতুন উপাচার্য, অসহযোগ কর্মসূচি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ও রাউজান প্রতিনিধি

চুয়েটে টানা ২১ দিনের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নবনিযুক্ত উপাচার্যের জোরপূর্বক প্রবেশ। ছবি: আজকের পত্রিকা

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির মধ্যে নবনিযুক্ত উপাচার্য ছাত্রদল নেতাদের নিয়ে তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভবনের ভেতরে রেখেই উপাচার্য ভবনের ফটকে তালা দেন এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনি ভবনের ভেতরে অবস্থান করছেন।

আজ সকাল সাড়ে ৮টায় একটি মাইক্রোবাসে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছান উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম। প্রশাসনিক ভবন-২-এ উপাচার্য ভবনের ফটকের তালা ভেঙে তিনি নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন।

উপাচার্যের সঙ্গে চুয়েট ছাত্র সংসদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রিয়াসাত আজিম সুমনের নেতৃত্বে সাত-আটজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইন উপস্থিত ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক আরাফাত হোসেনও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।

সাবেক ছাত্রদল নেতা রিয়াসাত আজিম সুমন বলেন, ‘আমরা ভিসি স্যারের সঙ্গে এসেছি। এখন যা বলার ভিসি স্যারই বলবেন।’

উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে সকাল ৯টা থেকে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে জড়ো হতে থাকেন। শিক্ষার্থীরা দুপুর ১২টার মধ্যে উপাচার্যকে ভবন ছেড়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দেন।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপাচার্য বের না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ভবনটিকে ‘ভ্যাকেন্ট’ ঘোষণা করে ফটকে তালা লাগান। ভবনটির বাইরে থেকে বিদ্যুৎ-সংযোগও বিচ্ছিন্ন করা হয়। তখন ভবনের ভেতরে উপাচার্য ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা ছিলেন বলে জানা গেছে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আফিফ কবির বলেন, ‘নতুন উপাচার্য কাউকে না জানিয়ে তালা ভেঙে প্রবেশ করেছেন। তাঁর এই আচরণ অত্যন্ত ঘৃণিত। আমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান করি।’

চুয়েট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জামাল উদ্দিন বলেন, ‘তালা ভেঙে তিনি ক্যাম্পাসে ঢুকেছেন। আমরা এটা মেনে নিতে পারি না।’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য চুয়েটের মূল ফটকের বাইরে অবস্থান করছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

সকালে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অনুরোধের পর আমার মনে হয়েছে, বাইরে থাকা ঠিক হবে না। তাই ক্যাম্পাসে চলে এসেছি।’

উপাচার্য জানান, তিনি ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের শিক্ষকদের জন্য অপেক্ষা করছেন। তাঁরা এলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে কথা বলবেন। তবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত তাঁর ডাকে কেউ সাড়া দেননি বলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ কর্মবিরতির পাশাপাশি সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও স্টাফ অ্যাসোসিয়েশন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটরিয়ামে তিন সংগঠনের যৌথ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বহিরাগতদের সহায়তায় নবনিযুক্ত উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশের ঘটনাকে তিনটি সমিতি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার উপাচার্যকে বহন করতে হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বেলা ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে হাটহাজারীর মদুনাঘাট এলাকায় চুয়েটগামী একটি বাস থামিয়ে হামলা চালান একদল লোক। তখন আন্দোলনরত যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আমিনুল কুদ্দুস চৌধুরীকে বাস থেকে নামিয়ে মারধর ও হেনস্তা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

একই সময়ে কুয়াইশ এলাকায় ট্রাক দিয়ে চুয়েটের আরও একটি বাসের গতিরোধের চেষ্টা করা হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাওয়ার পথে বহদ্দারহাট এলাকায় চুয়েটের ‘যমুনা’ নামের একটি বাসে হামলা হয়। হামলায় বাসের কাচ ভাঙচুর ও চালককে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

চুয়েটে টানা ২১ দিনের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে নবনিযুক্ত উপাচার্যের জোরপূর্বক প্রবেশ। ছবি: আজকের পত্রিকা

চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আজ চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসার মুহূর্তে মদুনাঘাটে কিছু সন্ত্রাসী দ্বারা আক্রান্ত হয় শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাস। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা অত্যন্ত শঙ্কিত, ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন।’

ড. আহসান উল্লাহ আরও বলেন, ‘একজন ভিসি নিয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হতে পারে, শিক্ষক হিসেবে আমরা তা কল্পনাও করতে পারি না। কেবল একটি পদের জন্য শিক্ষার্থীদের আক্রান্ত করব, এটা হতে পারে না। এর সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

হামলায় স্থানীয় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। ঘটনার পর শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। তবে স্থানীয় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক সায়েমকে সরানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ও তাঁকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে নতুন উপাচার্য এত দিন ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে যোগদানপত্র পাঠিয়ে তিনি অনলাইনে দায়িত্ব নেন।

পরে ১১ ও ১২ অক্টোবরের জন্য যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমানকে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তও প্রত্যাখ্যান করেন।

আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, উপাচার্য পদত্যাগ করলে ভবনের তালা খুলে দেওয়া হবে।