ভোলার মনপুরা উপজেলা রক্ষায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে বেড়িবাঁধ। সেই বাঁধেরও কয়েকটি স্থান ধস দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাউবোর সঠিক তদারকির অভাব এবং সাব-ঠিকাদার দিয়ে নিম্নমানের কাজের কারণে বৃষ্টিতেই ধসে যাচ্ছে বেড়িবাঁধ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভোলার মুজিবনগর ও মনপুরা উপকূলীয় বাঁধ পুনর্বাসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প নেওয়া হয়। ৫০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও বর্ষার কারণে বন্ধ ছিল। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবার কাজ শুরু হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে কাজ হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
বেড়িবাঁধ প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়েছে ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেগুলো হলো এনবিই, ওটিবিএল, জিসিএল, এলএকে এসএসএ, পিডিএল ও ওয়েস্টার্ন। এগুলোর মধ্যে এনবিই এবং ওটিবিএল মিলে ফারিসা নামে কাজ করছে। এ ছাড়া অন্যরা সাব-ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত দেড় মাসে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বিভিন্ন স্থান ধসে পড়েছে। পরে পাউবোর নির্দেশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তড়িঘড়ি করে ধসে যাওয়া অংশ মেরামত করে। গত মঙ্গল ও বুধবার টানা বৃষ্টিতে উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিমাংশে নির্মিত বেড়িবাঁধে ধস নামে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজে কাজ না করে সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করছে। এতে কাজের মান কমে যাচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বেড়িবাঁধ ধসে পড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মনপুরা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম পাশে নির্মিত বেড়িবাঁধ, হাজিরহাট ইউনিয়নের ২, ৩ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডে নির্মিত বেড়িবাঁধ ও দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের সূর্যমুখী এলাকায় বেড়িবাঁধ ধসে পড়েছে। কোথাও বেড়িবাঁধের বালু সরে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ধসে পড়া বেড়িবাঁধের মাটি ও বালু আমনখেতে পড়ে ধান নষ্ট হয়েছে।
হাজিরহাট এলাকার সোনারচর ২ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাপ্পীসহ অনেকে জানান, মেঘনা নদীর নিম্নমানের বালু বেড়িবাঁধে ব্যবহার করায় একটু বৃষ্টি হলেই বাঁধ ধসে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শাকিল কাজী, শুভ্র ও জিসান জানান, গত বছর বেড়িবাঁধের কাজের অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণ হারান ছাত্রদল নেতা রাশেদ। পরে একই বছরে মনপুরা ইউনিয়নের রামনেওয়াজ এলাকায় নির্মিত বেড়িবাঁধের গর্তে পড়ে মারা যায় ১০ বছরের এক শিশু।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফারিসার দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী মো. তুহিন বলেন, বেড়িবাঁধের কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীদের সামনে নিয়ম মেনে করা হচ্ছে। ধসে পড়া অংশ কাজ খনন মেশিন দিয়ে ঠিক করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে বেড়িবাঁধ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পাউবো ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েকটি স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং অল্প সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শুরু হবে।
এদিকে, মনপুরা ঘিরে থাকা মেঘনা নদীতে একাধিক ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু তোলা হয়। সেই বালু বাঁধ নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। আর বালু তোলার কারণেও বাঁধে ধস দেখা দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গত বুধবার কোস্ট গার্ড অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজারসহ ৫ জনকে আটক করে। এরপর থেকে বালু তোলা বন্ধ। তবে আবারও বালু তোলা শুরু হবে বলে জানান স্থানীয় নাহিদ, ফিরোজ, সামিম তালুকদার ও শুভ্র। তাঁরা বলেন, এর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারা জড়িত।
মেঘনার তীরসংলগ্ন এলাকা থেকে বালু তোলার বিষয়ে মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, মেঘনার তীর থেকে এক কিলোমিটার দূরে বালু তোলার অনুমতি সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া আছে। কেউ নির্দেশ অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এমদাদুল ইসলাম বলেন, উপকূলের কাছ থেকে বালু তোলার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।