খরা কাটিয়ে ইলিশের দেখা মিলতে শুরু করেছে বরিশালের নদ-নদীতে। তাই কয়েক দিন ধরে দামও কিছুটা কম। তবে মা ইলিশ ধরা পড়ায় চিন্তিত মৎস্য অধিদপ্তর।
এ মাসের শুরুর দিকে মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে দক্ষিণাঞ্চলে ইলিশের ওপর এক সমীক্ষায় বড় শঙ্কার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সমীক্ষার প্রাথমিক তথ্যে তাঁরা ইলিশ কমার জন্য চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। নদীতে ডুবচর-দূষণ, অতি আহরণ, রুট পরিবর্তন এবং অবৈধ জালে মাছ শিকারের কারণে ইলিশ উৎপাদন কমছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এর মধ্যে মৌসুমের শেষ দিকে বরিশাল বিভাগের মোকামগুলোতে ইলিশের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে তা আশানুরূপ নয় বলে দাবি ব্যবসায়ী ও মৎস্যজীবীদের।
বরিশাল নগরের পোর্ট রোড মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার নাসির উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, গত কয়েক দিনে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। দামও কমেছে মণপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা। কিন্তু ভরা মৌসুমে এটি খুব বেশি নয় বলে দাবি তাঁর।
নাসির উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার এক কেজি ওজনের নদীর ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৪০০, ৮০০-৯০০ গ্রামের প্রতি কেজি ২ হাজার এবং ৫০০ গ্রামের ইলিশ কেজিপ্রতি ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ দিন দেড় থেকে ২০০ মণ ইলিশ এসেছে পোর্ট রোডে। তবে সাগরের মোহনা থেকে কয়েকটি ট্রলারে আসা ইলিশের দাম অপেক্ষাকৃত কম ছিল। ইলিশ সরবরাহ গতকাল শুক্রবারও অনেকটা একই রকম ছিল। তবে অক্টোবরে নিষেধাজ্ঞার আগেভাগে দৈনিক হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হয় বলে জানান এই আড়তদার।
মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, বরিশালে ইলিশের উৎপাদন প্রতিবছরই কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশ উৎপাদন হয় ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই উৎপাদন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে।
উপকূলে ইলিশের উৎপাদন কমার কারণ খুঁজতে চালানো সমীক্ষার নেতৃত্বে থাকা ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিছুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, সমীক্ষার জন্য ৪ সেপ্টেম্বর বরিশালের হিজলা উপজেলার মেঘনা নদীতে, পটুয়াখালীর কলাপাড়ার আন্ধারমানিক নদীতে ৫ সেপ্টেম্বর, গলাচিপায় ৬ সেপ্টেম্বর এবং বরিশালের কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ নদে পর্যবেক্ষণ করেছেন। জরিপে তাঁরা ইলিশের উৎপাদন কমার চারটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো—নদীতে ডুবচর-দূষণ, অতি আহরণ, রুট পরিবর্তন এবং অবৈধ জালে মাছ শিকার।
আনিছুর রহমান বলেন, সাগর মোহনায় ট্রলিং বোট ইলিশের সর্বনাশ করছে। প্রাকৃতিক কারণে ইলিশ চলাচলের জন্য যে স্রোত, তা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রুট এবং বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ জানান, সমীক্ষার প্রাথমিক তথ্যে তাঁরা ইলিশ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য মনুষ্যসৃষ্ট বিষয়গুলো প্রতিরোধের সুপারিশ করবেন। বিশেষ করে নদীতে কারেন্ট জাল আর সাগরে ট্রলিং বোট বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আইনের বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।
বরিশাল জেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা ড. ওয়াহিদুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, সমীক্ষায় আসা বিশেষজ্ঞরা সরাসরি নদীতে এবং নদীতীরবর্তী জনপদের লোকজনের সঙ্গে কাজ করেছেন। ড. আনিছুর রহমান বলে গেছেন, ইলিশের অবস্থা খুবই খারাপ। এমন অবস্থা আগামী দুই বছর চললে ইলিশের উৎপাদন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
প্রসঙ্গত, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত নদ-নদীতে ইলিশ আহরণের ওপর টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সরকার।