বরিশাল নগরে বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বক্ষব্যাধি (টিবি) হাসপাতালের পেছনের ৭০ শতাংশ খাসজমির জলাশয় ভরাট করে দখলের অভিযোগ উঠেছে। নগরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত জলাশয়টি ২০ দিন ধরে বালু ফেলে দখল করে নেয় একটি চক্র। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক সাড়ে ১০ কোটি টাকা বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
সরেজমিন জলাশয়টি বালু দিয়ে অনেকাংশ ভরাট অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে বিএনপির লোকজন এটি ভরাট করে বেড়া দিয়ে দখল করে নিলেও কেউ বাধা দেয়নি। টিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় কাউনিয়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে টিবি হাসপাতালের পেছনের দিকে গিয়ে দেখা যায়, জলাশয়ের বিশাল অংশ বালু দিয়ে ভরাট করে ফেলেছে। পাশের বানী মন্দির স্কুলের সামনে টিনের বেড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছে। বালু ফেলে ভরাট করা জমির পাশেই টিবি হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতাল।
স্থানীয় মুন্সীবাড়ির বাসিন্দা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘৫০ বছর ধরে জানি, জলাশয় টিবি হাসপাতালের। কিন্তু এখন শুনেছি কয়েকজনে এই জমি নাকি কিনেছেন।’
৫৭ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করেন একজন ওষুধের দোকানি। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটি টিবি হাসপাতালের জলাশয়। গত ১৫-২০ দিন ধরে রাত ৯টা-১০টার দিকে জলাশয়টি ভরাট করেছে একটি প্রভাবশালী মহল। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।’
বালু দিয়ে ভরাটের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদার মো. জুয়েল বলেন, ‘আমরা প্রায় ২০ দিন ধরে জলাশয়টি বালু ফেলে ভরাটের কাজ করছি।’
টিবি হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এখানে টিবি হাসপাতালের ৭ একর ৪১ শতাংশ জমি রয়েছে। এর দাগ নম্বর ১০৬৯ (ভিটা), ১০৭০ (পুকুর), ১০৭১ (পুকুর)। খতিয়ান নম্বর ৪৮। পরচায় উল্লেখ রয়েছে এই জমির মালিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কালেক্টর। আমরা থানায়, এসি ল্যান্ড অফিসে ঘুরেছি। কিন্তু জমিটি বেহাত হওয়া ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।’
টিবি হাসপাতালের চিকিৎসা কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালসংলগ্ন এ জমি সরকারের। এখানকার পুরোনো স্টাফরাও জানেন, এটি সরকারি জায়গা। অথচ টিবি হাসপাতালের জলাশয়টি রাতের আঁধারে কে বা কারা ভরাট করছে।’
মাসুমা আক্তার আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে গত ১৯ জুলাই কাউনিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া সিভিল সার্জন, এসি ল্যান্ড এবং ডিসিকেও অবহিত করা হয়েছে। এসি ল্যান্ড বলেছেন, তাঁরা ওই জমির চারপাশে বেড়া দিয়ে দেবেন। কিন্তু সোমবার রাতেই একদল দখলদার গাছপালা কেটে বেড়া দিয়ে দিয়েছে। পুলিশের একজন কর্মকর্তা ঘুরে দেখে গেছেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
পরিত্যক্ত জলাশয়টির মালিকানা দাবিদার রাকিবুল ইসলাম লিয়ন বলেন, ‘৬৯ শতাংশের এই জমির মালিক স্থানীয় হেলাল আকন ও তাঁর বোন। তাঁদের কাছ থেকে চারজনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব বাবুল তালুকদার, মো. আলমগীর ও রাকিবুল ইসলাম লিয়ন।’
লিয়ন দাবি করেন, টিবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুয়া অভিযোগ দিয়েছে। জমিটি যে হাসপাতালের, তেমনটা দাবি করেনি তারা।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লিয়ন একজন যুবদল নেতার ঘনিষ্ঠজন। একই ওয়ার্ডের বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জমিটি দখলের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন। ওই এলাকার প্রতি শতাংশ জমির বাজারমূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী ৭০ শতাংশ জমির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই জমি দখল করতে স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতারা একজোট হয়েছেন।
৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামন ফারুক বলেন, ‘আমি জানি ওই জমি কেনাবেচা হয়ে গেছে। তাঁরা মালিকের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছেন। এখানে জালজালিয়াতি হয়েছে কি না, তা ভূমি অফিস বলতে পারবে।’
বরিশাল সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘টিবি হাসপাতালের পাশের ওই জমি একটি দুষ্টচক্র ঘিরে ফেলেছে। আমরা বেড়া দেওয়ার আগেই চক্রটি সেখানে টিনের বেড়া দিয়ে রেখেছে। বিএস রেকর্ডে জমিটি ব্যক্তিমালিকানা দেখানো হয়েছে। তারা যে কাগজই দেখাক না কেন, এটা যেহেতু খাস খতিয়ানের জমি, সেহেতু তারা জমিটি নিতে পারবে না।’
আজহারুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এ জমি তাদের কাছে কী করে গেল, তা চ্যালেঞ্জ করতে ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হবে। জিপিকে এ মামলার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমি নিশ্চিত, ১০-১৫ বছর আগে জরিপকালে টাকাপয়সা দিয়ে জমিটি এসএ খতিয়ানে ওঠানো হয়েছে। এই জমি যাতে কোনোভাবে বিক্রির জন্যও দলিল করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাসপাতালের এত বড় একটি জমি ২০ দিন ধরে দখল করা হলো, অথচ এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসন তাহলে কী করল? এখন মামলায় গেলে অনেক সময় লাগবে এটি উদ্ধার করতে। সরকারি সম্পত্তি বেহাত ঠেকাতে যা যা করার দরকার, তা-ই করা হবে।’
জমি দখলের বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মামুন খন্দকার বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। ঘটনাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’