বরিশালের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান জন্ম দেওয়ার পরপরই নাজিয়া রহমান মাইশা (৩০) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নগরের রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। অস্ত্রোপচার কক্ষে বমি করার পর মাইশার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয় বলে স্বজনেরা জানান।
মাইশার পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসকদের অবহেলার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বমি করার সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে শ্বাসরোধে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
মাইশা নগরের কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা প্রয়াত মো. নাজমুর রহমান বাদলের মেয়ে। তিনি একজন উদীয়মান উদ্যোক্তা ছিলেন।
স্বজনেরা জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেজিস্ট্রার ডা. তহুরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাইশা। পরে তাঁর পরামর্শে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের জন্য রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে।
বৃহস্পতিবার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মাইশার একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এরপরই অস্ত্রোপচার কক্ষে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে স্বজনেরা জানান।
মাইশার স্বামী হাফিজ আহমেদ বলেন, ‘যে মানুষটা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকল, সেই মানুষটা সেখান থেকে কীভাবে মৃত হয়ে বের হয়? চিকিৎসকের অবহেলায় এমন মৃত্যু মেনে নেওয়ার মতো নয়।’
মাইশার স্বজন সাজ্জাদ হোসেন নয়ন অভিযোগ করেন, মাইশা স্বাভাবিকভাবে হেঁটে অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছিলেন। অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পরপরই তিনি অসুস্থ হয়ে বমি করতে শুরু করেন। তাঁর অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অবহেলার কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে।
নয়ন আরও অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক রোগীর পাশে ছিলেন না। স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর তিনি অন্য রোগীর কাছে চলে যান। হাসপাতালের চারটি অপারেশন থিয়েটারের জন্য ডা. সোহেল মিয়া একাই দায়িত্বে ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা চিকিৎসক তহুরা আক্তারের অসাবধানতার কারণেও মাইশার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।
নয়নের দাবি, মৃত্যুর পর বিষয়টি আড়াল করতে মাইশাকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মাইশার মৃত্যু হয়েছে।
তবে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের ব্যবস্থাপক সাহিল আহমেদ সাকিব বলেন, শ্বাসনালিতে খাবার আটকে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
সাকিবের ভাষ্য, মাইশাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসকেরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন। পরে স্বজনেরা সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের অনুরোধ করেন। এরপর ডা. তহুরা আক্তার অস্ত্রোপচার শুরু করেন। অস্ত্রোপচার শেষে মা ও সন্তান দুজনই ভালো ছিলেন। তিনি বলেন, ‘পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে নেওয়ার পর হঠাৎ মাইশার রক্তচাপ কমতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি তিনবার বমি করেন। তখন সাকার দিয়ে মুখের ভেতর থেকে বমি পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাঁকে শেবাচিম হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।’
সাকিব আরও বলেন, ‘আইসিইউ থেকে জানতে পেরেছি, বমি করার সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে শ্বাসরোধ হয়ে মাইশার মৃত্যু হয়েছে।’
এদিকে ঘটনার পর থেকে ডা. তহুরা আক্তার ও ডা. সোহেল মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মাইশার স্বজনেরা। তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি তাঁদের।
এ বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ তিনি পাননি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।