বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জে নদীভাঙন যেন নিত্যদিনের দুর্ভোগ। মেঘনাসহ বিভিন্ন নদীর ভাঙনে দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ, ঘরবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়লেও ভাঙনরোধে প্রস্তাবিত ১৫টি জরুরি প্রকল্পের ১৪টিই পড়েছে মেহেন্দীগঞ্জে, হিজলায় মাত্র ১টি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের শিকার হিজলা। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, বৈষম্য করা হয়নি।
হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে বরিশাল-৪ আসন। এই আসনের সংসদ সদস্য প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান। গত ১৬ জুলাই তিনি নদীর তীর প্রতিরক্ষায় পানিসম্পদমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ডিও লেটার দেন। এতে দুই উপজেলার নদীভাঙনকবলিত ১৫টি এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়। এগুলোর মধ্যে ১৪টি এলাকা মেহেন্দীগঞ্জে এবং ১টি হিজলায়।
বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপি নেতাসহ হিজলার সাধারণ মানুষ। তাঁরা বলেন, যুগ যুগ ধরে এভাবে তাঁরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
ভাঙন প্রতিরোধে প্রস্তাবিত এলাকা হলো, মেহেন্দীগঞ্জের চরএককরিয়া ইউনিয়নের দাদপুর এলাকা, আদর্শ নগর ইউনিয়নের নলবুনিয়া, দড়িরচর খাজুরিয়া ইউনিয়নের গাজীরহাট ও বামনের চর, চরগোপালপুর ইউনিয়নের চরমিঠুয়া, মোস্তফা বাজার ও চরমিঠুয়া হাইস্কুল; জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ জাঙ্গালিয়া, খাসকান্দি, লেঙ্গুটিয়া লঞ্চঘাট, চরশেফালি ও আমীরগঞ্জ; সদর ইউনিয়নের ধুলিমধ্যচর এবং উলানিয়া ইউনিয়নের উলানিয়া লঞ্চঘাট ও স্কুল। এ ছাড়া হিজলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের ঘোষেরচর এলাকা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘোষেরচর এলাকা ছাড়াও হিজলার গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পত্তনী ভাঙা হাজারিবাড়িসংলগ্ন এলাকা নয়া ভাঙলী নদীর ভাঙনের মুখে পড়েছে। একইভাবে গুয়াবাড়িয়া ইউনিয়নের ঘোষেরচর লঞ্চঘাট, হিজলা-গৌরব্দী ইউনিয়নের অরাকুল গ্রাম, হিজলা-গৌরব্দী ইউনিয়নের মান্দ্রা চর কুসরিয়া গ্রামে মেঘনা নদীর তীর, বড়জালিয়া ইউনিয়নের দুর্গাপুর লঞ্চঘাট এবং ২ নম্বর মেমানিয়া ইউনিয়নের চর দুর্গাপুর খেয়াঘাটে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
হিজলা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলম রাজুর বাড়ি হিজলা উপজেলার বড়জালিয়া ইউনিয়নের মেঘনাতীরবর্তী লক্ষ্মীপুর গ্রামে। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নদীভাঙন রোধে হিজলায় ১টি এবং মেহেন্দীগঞ্জে ১৪টি প্রকল্পের ডিও লেটার দেওয়া বৈষম্যের অন্যতম নিদর্শন। কারণ, মেহেন্দীগঞ্জের মানুষ হিজলাকে কলোনি মনে করে। এই অবস্থার সৃষ্টি ৯০ দশক থেকে। ১৯৯১ সালে বিএনপির মোশাররফ হোসেন মঙ্গু এমপি থাকাকালীন মুলাদীবাসী হিজলাকে কলোনি ভাবতেন। ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনবার মঙ্গু এমপি থাকাকালীন অবহেলিত ছিল হিজলার জনগণ। মঙ্গু মুলাদীর বাসিন্দা হওয়ায় তখন সব উন্নয়ন হয়েছে সেখানে।’
রাজু বলেন, ‘২০০৮ থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত বিএনপির এমপি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদের সময়ও একইভাবে অবহেলিত ছিল হিজলা। কারণ, মেজবাহ ভাইয়ের বাড়ি ছিল মেহেন্দীগঞ্জ। এরপর আওয়ামী লীগের এমপি পংকজ নাথের সময় একচেটিয়া উন্নয়ন হয়েছে মেহেন্দীগঞ্জে। কারণ, পংকজের বাড়ি মেহেন্দীগঞ্জে।’
বিএনপি নেতা রাজুর প্রত্যাশা, এমপি রাজিব আহসানের বাড়ি মেহেন্দীগঞ্জ হলেও তিনি হিজলাবাসীকে উন্নয়ন বঞ্চিত করবেন না।
হিজলা উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাবেদ হোসেন বলেন, ‘সম্প্রতি নদীভাঙন রোধে ১৫টি স্থান সংস্কারে প্রতিমন্ত্রী মহোদয় সুপারিশ করেছেন। এগুলোর মধ্যে হিজলা গুয়াবাড়িয়ার ঘোষেরচর রয়েছে। বাকি ১৪টি স্পট মেহেন্দীগঞ্জের।’ তিনি বলেন, ‘এখানে বরাদ্দ অনুপাতে হিজলার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। এটা আগের আমলেও হয়েছে।’
হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন বলেন, ‘হিজলায় এই বর্ষায় নদীভাঙন রোধে আমরা মানববন্ধনও করেছি। সস্প্রতি নদীভাঙন ঠেকাতে ১৫টি ছোট প্রকল্পের সুপারিশ করেছেন প্রতিমন্ত্রী। এগুলোর মধ্যে হিজলার ১টি ও মেহেন্দীগঞ্জের ১৪টি।’ তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ভাই (রাজিব আহসান) হিজলা এলে তাঁকে এ বিষয়ে দৃস্টি আকর্ষণ করেছি আমরা। কিন্তু তিনি বলেছেন, হিজলার নদীভাঙন রোধে বড় প্রকল্প হবে। এগুলো খুচরা কাজ, তাৎক্ষণিক বরাদ্দ।’
এ বিষয়ে জানতে বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠজন মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক দিপেন জমাদ্দার বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী বৈষম্য করেন না। ডিও লেটার কয়টা লাগবে হিজলাবাসীর। হয়তো হিজলার কেউ দাবি করেননি, তাই নদীভাঙন রোধে সেখানে কম প্রকল্প হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘হিজলা কিংবা মেহেন্দীগঞ্জ নয়; বরং যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই উন্নয়ন করবেন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।’
বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসানের ডিও লেটার সংবলিত ১৫টি প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে নদীভাঙন এলাকা হিজলায় ১টি এবং মেহেন্দীগঞ্জে ১৪টি। এই তালিকা প্রতিমন্ত্রী মহোদয় করেছেন। এটি কী হিসেবে করেছেন, তা তিনিই বলতে পারবেন।’ প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল স্বীকার করেন, মেহেন্দীগঞ্জের মতো হিজলাও সমানভাগে নদীভাঙনকবলিত এলাকা। তিনি ওই দুই উপজেলার আনাচ-কানাচে ঘুরেছেন।