বরগুনার তালতলী উপজেলার বড় অঙ্কুজানপাড়া গ্রামে পায়রা নদীর মোহনায় নির্মিত কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হয়েছে সাড়ে চার বছর আগে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয়দের কিছু কর্মসংস্থানের সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়েছিল প্রত্যন্ত এ জনপদের মানুষ। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এলাকার পরিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলায় তাদের আশাবাদ রূপ নিয়েছে গভীর উদ্বেগে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য আর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কয়লার কারণে এ অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
তালতলী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে পায়রা নদীর তীরে সাগর মোহনায়। কাছের বিষখালী নদীও সাগরে মিশেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরী বনাঞ্চল (ফাতরার বন), ‘শুভসন্ধ্যা’ সমুদ্রসৈকত, টেংরাগিরী ইকোপার্ক। নদীর অন্য প্রান্তে রয়েছে হরিণঘাটা বন। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বর্জ্য দুই নদীর পানি দূষিত করছে, অন্য দিকে চিমনি দিয়ে নির্গত ধোঁয়া বড় অঞ্চলজুড়ে পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি করছে। স্থানীয় পরিবেশবিদ, পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও চিকিৎসকেরা এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
তালতলীতে চায়না রিসোর্স নির্মিত ৩০৭ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গত ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি চালু হয়। এ প্রকল্পের ৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক দেশীয় প্রতিষ্ঠান আইসোটেক। প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পটিতে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে এখানকার নির্মল উপকূলীয় পরিবেশ আর মোটেই আগের মতো নেই। এর কালো ধোঁয়া ও অন্যান্য বর্জ্য গ্রামবাসীর জীবনের ওপর যেন কালো ছায়া ফেলেছে। এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যের ক্ষতির পাশাপাশি এটি তাদের জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে—এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, টেংরাগিরী বনের মাত্র ৩ কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপিত হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বনের গাছগাছালি, পশুপাখির ওপর। বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি, কয়লা পোড়ানো ছাই ও কালো ধোঁয়ায় এখানকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পথে।
উপকূল ও পরিবেশ বিষয়ে সাংবাদিকতা করা রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কাছেই সংরক্ষিত বন থাকলেও এটি কাগজে-কলমে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়েছিল। তবে বাস্তব পরিবেশ এ ছাড়পত্র দেওয়ার অনুকূলে নয় বলেই আমরা মনে করি।’
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে এ গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষও বিভিন্ন রকম বায়ুবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এর চিমনি থেকে নির্গত ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাবে ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হচ্ছে। অনেক শিশু ও বৃদ্ধ শ্বাসকষ্টে ভুগছেন।
তালতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিৎসক বলেন, ‘বায়ুদূষণে অনেকে শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নদীর দূষণে ত্বকের সমস্যা হচ্ছে। গত দুই মাসে চর্মরোগী ও হাঁপানি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।’
তালতলী গ্রামের বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘একসময় এখানে বাতাস ছিল পরিষ্কার। এখন শুধু বিষাক্ত কয়লার ধোঁয়া। আমার ৫ বছরের শিশুসন্তান বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়েছে। শরীরের অনেক স্থানে লাল দাগ দেখা দিয়েছে। সরকার না হয় বিদ্যুৎ দিল, কিন্তু আমার মেয়ে কীভাবে বাঁচবে?’
বিদ্যুৎকেন্দ্রের দূষণ কাছের টেংরাগিরী অভয়ারণ্যের বৃক্ষলতা এবং বন্য প্রাণীকেও ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদ ও আন্দোলনের কর্মীরা।
এ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান কাঁচামাল খনিজ কয়লা। পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনা দিয়ে জাহাজে করে এখানে কয়লা নিয়ে আসা হয়। নামানোর সময় কিছু কয়লা ও গুঁড়া নদীর পানিতে পড়ে মিশে যায়। গরম পানিসহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্যও এই নদীতে ফেলা হয়। নদীর পানির এই দূষণ ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলছে বলে স্থানীয় লোকজনসহ অনেকের ধারণা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রটি মোহনায় হওয়ায় সাগর থেকে ডিম ছাড়তে আগের মতো বেশিসংখ্যায় ইলিশ মাছ পায়রা ও বিষখালীতে আসছে না। বিগত কয়েক বছর যে আশানুরূপ ইলিশ উৎপাদন হচ্ছে না, এটা তার অন্যতম কারণ।
পায়রা নদীর জেলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে আর মাছ নেই। কয়লার ধোঁয়া ও ময়লা পানি মাছের ক্ষতি করছে। জাল ফেললে ময়লা আর মরা মাছই ওঠে বেশি।’
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এই কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থ আমাদের নদী ও সাগরের পানির গুণমানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। অ্যালুমিনিয়াম, মিথেন, সালফার ডাই-অক্সাইড ও ভারী ধাতু পানিতে মিশে জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বিপদ তৈরি করছে। এতে মাছের জীবনচক্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অনুষদের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান আজকের পত্রিকাকে জানান, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর বর্জ্য ও কয়লা নদীর পানিতে মিশে মৎস্য সম্পদের চরম ক্ষতি করছে। পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন ও বেনজো পাইরিনের মতো ক্ষতিকর পদার্থ নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছে। এসব পদার্থ ক্যানসার সৃষ্টি করে। নদীর মাছের মাধ্যমে মানুষের দেহেও তা প্রবেশ করতে পারে। এগুলোসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থের কারণে নদীর মাছ শ্বাসনালি আটকে মারা যায়। এই বর্জ্যমিশ্রিত পানির কারণে পায়রা ও বিষখালীর অভয়ারণ্য থেকে মাছ ভয়ে অন্য দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়রা বলেছেন, টেংরাগিরী বনাঞ্চলের গাছপালা মরে যাচ্ছে। বনের বিভিন্ন স্থানে পশুপাখির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও বনায়ন অনুষদের প্রফেসর ড. মো. মাসুদুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধোঁয়া টেংরাগিরী ও হরিণঘাটা বন ও সেখানকার প্রাণীদের জন্য চরম হুমকি। কয়লা থেকে উৎপন্ন হওয়া ধোঁয়া থেকে কার্বন, সালফার, ফসফরাস ও থোরিয়ামের মতো গ্যাস বায়ু ও মাটিতে মিশে পরিবেশের ক্ষতি করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র খুবই প্রয়োজন। তবে এর থেকে সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ যতটা কমিয়ে আনা যায়, ততই ভালো।’
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত পানি পরিশোধন করে ও তাপমাত্রা কমিয়ে তারপর নদীতে ছাড়তে হয়। সবচেয়ে ভালো হয়, যদি সে পানি পুনর্ব্যবহার করা যায়। কিন্তু গরম পানি সরাসরি নদীতে ছাড়া হলে তা শুধু মাছের প্রজনন ও বিচরণে প্রভাব ফেলে না, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রকেই ব্যাহত করে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে নদীর বাইরে পুরো ইকোসিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে। তালতলীতেও তাই হচ্ছে।’
তালতলীর পায়রা নদীর মোহনায় নয়নাভিরাম শুভসন্ধ্যা সাগর সৈকতের অবস্থান। একসময় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এ সৈকতে আসত পরিবার-পরিজন নিয়ে। অনেক পর্যটন ব্যবসায়ী এখানে হোটেল ও রেস্তোরাঁ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণের সময়ে সৈকতের সামনে থেকে বালু তোলায় তীব্র ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে বরগুনার এই পর্যটন সম্ভাবনা।
ভাঙনের মূল কারণ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে দায়ী করে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর তালতলী সমন্বয়ক মো. আরিফুর রহমান বলেন,‘শুভসন্ধ্যা সৈকতের সামনে সাগর মোহনা থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করায় সৈকতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে অপরূপ এই সৈকতের অর্ধেকের বেশি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে।’