১৯৯১ থেকে ২০২৬—৩৫ বছরে বরগুনার উপকূলে বারবার ভেসে এসেছে মৃত তিমি। কখনো বঙ্গোপসাগরের তীরে, কখনো নদীর মোহনায়, আবার কখনো চরের বালুতে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে বিশাল এই সামুদ্রিক প্রাণীর মরদেহ। প্রতিবারই সম্ভাব্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জাহাজের ধাক্কা, মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়া, প্লাস্টিক ও অন্যান্য দূষণ কিংবা সমুদ্রের পরিবর্তিত পরিবেশের কথা। তবে কোনো ঘটনাতেই বৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যায়নি।
মরদেহ উদ্ধারের পর দ্রুত পচন শুরু হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মাটিচাপা দিতে হয়েছে। ফলে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও নষ্ট হয়েছে। দেশের উপকূলে বারবার তিমি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে ধারাবাহিক গবেষণা, সমন্বিত তথ্যভান্ডার কিংবা মৃত তিমির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরা।
বরগুনা উপকূলে ১৯৯১ সালে প্রায় ৪৮ ফুট দীর্ঘ একটি তিমি ভেসে আসার পর ২০১৪,২০২৪ ও সর্বশেষ ২০২৬ সালেও মৃত তিমি পাওয়া গেছে। ঘটনাগুলোর মধ্যে ব্যবধান কখনো দীর্ঘ, কখনো তুলনামূলক কম। কিন্তু প্রতিবারই একই প্রশ্ন উঠেছে—কেন মারা যাচ্ছে সমুদ্রের এই বিশাল প্রাণী?
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালে তালতলীর জোয়ালভাঙ্গা চরে প্রথমবারের মতো একটি বিশাল তিমির মরদেহ ভেসে আসে। প্রায় ৪৮ ফুট দীর্ঘ তিমিটিকে বালুচরে মাটিচাপা দেওয়া হয়। কয়েক মাস পর সেখান থেকে হাড় সংগ্রহ করে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়। পরে বিশাল কঙ্কালটি ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে নেওয়া হয়। বর্তমানে জাদুঘরের প্রাকৃতিক ইতিহাস বিভাগের একটি গ্যালারিতে কঙ্কালটি প্রদর্শিত হচ্ছে।
তখন তিমিটির মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা হলেও মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করার মতো প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ ছিল না। ফলে জাহাজের ধাক্কা, মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়া কিংবা অসুস্থতার মতো সম্ভাব্য কারণের কথাই সামনে আসে।
এর প্রায় দুই যুগ পর ২০১৪ সালে তালতলীর নলবুনিয়ার চরে আবারও একটি মৃত তিমি ভেসে আসে। ততক্ষণে তিমিটির শরীরে ব্যাপক পচন ধরায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়ভাবে কঙ্কাল সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বন বিভাগ ও প্রশাসনের সহায়তায় চরে গভীর গর্ত করে সেটি পুঁতে ফেলা হয়। তখনো বিশেষজ্ঞরা গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজের ধাক্কা অথবা বাণিজ্যিক মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেছিলেন।
এর প্রায় এক দশক পর, ২০২৪ সালের ১ জুলাই বরগুনা সদর উপজেলার পায়রা নদীর মোহনার ছোনবুনিয়া এলাকার একটি চরে আরও একটি মৃত তিমি পাওয়া যায়। স্থানীয়ভাবে এর দৈর্ঘ্য ৩২ থেকে ৩৬ ফুট বলে জানানো হয়। উপকূলে পৌঁছানোর আগেই তিমিটি মারা গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পচন ধরায় চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র দুর্গন্ধ।
তখন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও পরিবেশকর্মীরা প্রাথমিকভাবে বড় বাণিজ্যিক জাহাজের প্রপেলারের আঘাত, পানিদূষণ বা বিষক্রিয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ময়নাতদন্ত না হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে তালতলী উপজেলার বড়বগি ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের কাছে আন্দারমানিক নদীর তীরে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় ৩২ ফুট দীর্ঘ একটি মৃত তিমি দেখতে পান। খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ সেটি দেখতে ভিড় করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজন জানান, তিমিটির শরীরে পচন ধরেছিল। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে মরদেহটি নড়াচড়া করছিল। পরে ভাটার সময় সেটি আবার গভীর সমুদ্রের দিকে ভেসে যাওয়ার চেষ্টা করে।
তালতলী বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, নিশানবাড়িয়ার একটি চরে স্কেভেটর দিয়ে মাটি খুঁড়ে তিমিটির মরদেহ পুঁতে ফেলা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ জানতে পরীক্ষার জন্য তিমিটির শরীর থেকে টিস্যু সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কীভাবে টিস্যু সংরক্ষণ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লবণ পানিতে রাখা হয়েছে। ঢাকার কোনো প্রতিষ্ঠান নমুনা চাইলে তা পাঠানো হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী ছবি পর্যালোচনা করে তিমিটিকে প্রাথমিকভাবে বেলিন গোত্রের ব্রাইডস তিমি বলে ধারণা করেছেন।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে এ প্রজাতির বিচরণ রয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। জাহাজের ধাক্কা, প্লাস্টিক বা বর্জ্য গ্রহণ, মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়া কিংবা অসুস্থ হয়ে অগভীর পানিতে আটকে পড়ার মতো কারণ থাকতে পারে।
সম্প্রতি তালতলীতে ভেসে আসা মৃত তিমিটি দেখতে যাওয়া স্থানীয় জেলে শহীদ মিয়া বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই সাগরে মাছ ধরছি। এখন আগের তুলনায় নানা ধরনের বর্জ্য ও জাল চোখে পড়ে। তিমি বা ডলফিন মারা গেলে আমাদেরও ভয় হয়। তবে সমুদ্রে আসলে কী পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা আমরা জানি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও গণমাধ্যমকর্মী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এত বড় প্রাণী আগে মাঝেমধ্যে দেখেছি। কিন্তু মৃত অবস্থায় বারবার ভেসে আসাটা স্বাভাবিক মনে হয় না। সরকার যদি প্রতিবার মৃত্যুর কারণ পরীক্ষা করে জানত, তাহলে আমরাও বুঝতে পারতাম সমস্যাটা কোথায়।’
কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান সামুদ্রিক প্রাণীর ধারাবাহিক মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে দ্রুত সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরির দাবি জানিয়ে বলেন, একটি তিমি মারা গেলে শুধু একটি প্রাণী হারায় না, সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বারবার তিমি, ডলফিন ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
আরিফুর রহমানের অভিযোগ, উপকূলীয় এলাকায় মৃত তিমি ভেসে আসার পর দ্রুত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করার মতো আধুনিক মেরিন ফরেনসিক সুবিধা নেই। ফলে পচনশীল মরদেহ দ্রুত সরিয়ে মাটিচাপা দিতে হয়। এতে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত দল গঠন, জাতীয় পর্যায়ে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর ডাটাবেজ তৈরি, মৃত তিমি ও ডলফিনের নমুনা পরীক্ষার জন্য আধুনিক ল্যাব স্থাপন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্রে জাহাজ চলাচল ও গতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বিশেষ করে ‘সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ সহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের প্রভাব নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি সাগরে প্লাস্টিক ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ফেলা বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও মেরিন সায়েন্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান আজকের পত্রিকাকে বলেন, একটি তিমির মৃত্যুকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বারবার একই উপকূলীয় অঞ্চলে বড় সামুদ্রিক প্রাণীর মরদেহ পাওয়া গেলে এর পেছনে পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট কারণ আছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তিমির মৃত্যুর অন্যতম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে সমুদ্রে ‘ঘোস্ট গিয়ারিং’। ছোট-বড় মাছ ধরার ট্রলারে ব্যবহৃত প্লাস্টিকের কারেন্ট জালে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত মাছ আটকা পড়লে জেলেরা অনেক সময় মাছসহ জাল সমুদ্রে ফেলে দেন। এসব পরিত্যক্ত জালে আটকে কিংবা জালের সঙ্গে থাকা মাছ খেয়ে তিমি, ডলফিন ও কচ্ছপের মতো বড় সামুদ্রিক প্রাণী মারা যেতে পারে।
অধ্যাপক হেমায়েত জাহান বলেন, তিমি বয়সজনিত কারণে স্বাভাবিকভাবেও মারা যেতে পারে। আবার সমুদ্রে চলাচলকারী জাহাজের আঘাতে গভীর সমুদ্রে মারা যাওয়ার পর স্রোতের টানে মরদেহ উপকূলে ভেসে আসতে পারে। প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্যও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য বড় হুমকি। নদী ও স্থলভাগ থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। এসব বর্জ্য সামুদ্রিক প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করলে খাদ্য গ্রহণ, হজম ও স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, সমুদ্রে কী পরিমাণ প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণ ছড়াচ্ছে এবং এর সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা জানতে মৃত তিমির পাকস্থলী, টিস্যু ও অন্যান্য অঙ্গের নমুনা পরীক্ষা করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের পরিচালক অধ্যাপক ড. এস. এম. শরীফুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলসীমায় সাম্প্রতিক তিমি মৃত্যুর ঘটনাগুলোকে কোনো একক কারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না করে ‘মানবসৃষ্ট চাপ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব’ হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।
তাঁর মতে, দুটি সম্ভাব্য কারণ বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন—প্রথমত, মাছ ধরার জালে আটকে যাওয়া বা অনিচ্ছাকৃত আহরণ (বাইক্যাচ)। উপকূলীয় ও গভীর সমুদ্রের মাছ ধরার এলাকায় ব্যবহৃত জাল এবং পরিত্যক্ত মাছ ধরার সরঞ্জামে তিমি আটকে গিয়ে গুরুতর আহত, দুর্বল কিংবা শেষ পর্যন্ত ডুবে মারা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সমুদ্রের পরিবেশগত পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, সমুদ্রস্রোত, সামুদ্রিক উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য প্রজাতির বিস্তরণে পরিবর্তন হলে তিমির খাদ্য প্রাপ্যতা ও বিচরণক্ষেত্রও বদলে যেতে পারে। এর ফলে তারা অস্বাভাবিকভাবে উপকূলের কাছাকাছি চলে এসে মাছ ধরার জাল ও নৌযানের সংস্পর্শে পড়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে এসবকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হিসেবে নয়। প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মৃত তিমির ময়নাতদন্ত (necropsy), টিস্যু ও অঙ্গের রোগ তাত্ত্বিক পরীক্ষা (histopathology), বিষাক্ত পদার্থের পরীক্ষা (toxicology) এবং জীবাণু বিষয়ক পরীক্ষা (microbiological analysis) করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মৃত্যুর স্থান ও সময়ের সঙ্গে মাছ ধরার এলাকা, নৌযান চলাচলের পথ এবং অস্বাভাবিক সামুদ্রিক-প্রাকৃতিক অবস্থার স্থানিক ও সময়গত সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি।
অধ্যাপক শরীফুজ্জামানের মতে, সাম্প্রতিক তিমি মৃত্যুগুলো নির্দিষ্ট মাছ ধরার এলাকা, নৌযান চলাচলের পথ অথবা অস্বাভাবিক সামুদ্রিক পরিবেশগত অবস্থার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সম্পর্কিত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিমিটি বয়সজনিত বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক কারণে মারা যাওয়ার পর সমুদ্রস্রোত ও জোয়ার-ভাটার প্রভাবে মরদেহ উপকূলে ভেসে এসেছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রাখা উচিত।