প্রবল স্রোত, নদীভাঙন আর পাহাড়ধসে নদীর তলদেশে জমে থাকা বড় বড় পাথরের স্তূপে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার সাঙ্গু নদের উজানের নৌপথ। কোথাও তৈরি হয়েছে প্রবল স্রোতধারা, কোথাও গভীর খাদ। এর মধ্যে তুরুগু স্বং এলাকায় পাহাড়ধসে নদীর তলদেশে জমে থাকা বড় বড় পাথরের স্তূপ নৌযান চলাচলে তৈরি করেছে মরণফাঁদ।
জানা গেছে, দুর্গম রেমাক্রী ইউনিয়নের বড়মদকসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম এই নদীপথ। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাজার ও জরুরি প্রয়োজনে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়েই সাঙ্গু নদ পাড়ি দিতে হয়। বর্ষা মৌসুমে প্রবল স্রোতে আতঙ্ক আরও বাড়ে। যেকোনো সময় নৌকাডুবি ও প্রাণহানির আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করতে হয় তাঁদের।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালে ভারী বর্ষণে সাঙ্গু নদের উজানে পাহাড়ধস ও তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এতে নদীর বিভিন্ন স্থানে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে তৈরি হয় ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও গভীর খাদ। তুরুগু স্বং এলাকায় পাহাড়ধসে নদীতে পড়ে থাকা বড় বড় পাথর এখন নৌযান চলাচলের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রবল স্রোতে পাথরের স্তূপের পাশ দিয়ে প্রতিদিন ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করছে। নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা অথবা ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করার ব্যবস্থা। স্রোতের টানে একটু নিয়ন্ত্রণ হারালেই নৌকা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইঞ্জিনচালিত নৌকার চালক মংমংসে মারমা ও ওয়াইন মংসিং মারমা বলেন, ‘বর্ষায় তীব্র স্রোতের কারণে তুরুগু স্বং এলাকা পার হওয়া খুবই কঠিন। শুষ্ক মৌসুমেও নদীর তলদেশে থাকা বড় পাথরের কারণে ঝুঁকি থাকে। স্রোতের টানে নৌকা নিয়ন্ত্রণ হারালে মুহূর্তেই পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মংমে মারমা, জিনিঅং মারমা ও চসিংমং মারমা বলেন, স্রোত কমলেও তুরুগু স্বংয়ের বিপদ কমেনি। নদীর বুকজুড়ে থাকা বিশাল পাথরের কারণে নৌ চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে নদীর গতিপথও পরিবর্তন হয়েছে। পাথরগুলো অপসারণ করা গেলে পুরোনো নৌপথ ফিরে আনা সম্ভব। তাঁরা দ্রুত নৌপথ সংস্কার ও পাথর অপসারণের দাবি জানান।
রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা (রনি) বলেন, ‘তুরুগু স্বংয়ে কয়েকটি বিশাল পাথর পড়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। এতে নৌযান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। বিষয়টি পার্বত্যমন্ত্রীর কাছে জানিয়ে সংস্কারের আবেদন করা হয়েছে।’
তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের লাংলোক স্বং এলাকায় বর্ষা মৌসুমে তীব্র স্রোত এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে থাকা বড় পাথরের কারণে নৌ চলাচলে ঝুঁকি থাকে। স্রোতের টানে নৌকার নিয়ন্ত্রণ হারালে মুহূর্তেই পাথরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে নৌকা ডুবে যাওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে।’
তিন্দু ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ক্রানিঅং মারমা বলেন, লাংলোক স্বংয়ের মতো তিন্দু স্বং এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন শত শত পর্যটকবাহী নৌকার পাশাপাশি স্থানীয় নৌকাও ঝুঁকি নিয়ে এ পথে চলাচল করে। নদীর এসব বড় পাথর সরানো গেলে নৌ চলাচলের ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে দাবি করেন তিনি।
বিজিবির বান্দরবান জোনের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মুহাম্মদ রুবায়াত জামিল বলেন, ‘২০২৪ সালে বড়মদক এলাকায় সাঙ্গু নদের ভাঙনে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। সম্প্রতি ওই এলাকায় টহল দলের একটি নৌকাও ডুবে যায়। খরস্রোতে তলিয়ে যাওয়া অস্ত্র ও সরঞ্জাম উদ্ধারে চার দিন সময় লেগেছে।’
রুবায়াত জামিল বলেন, ১৭ ইসিবিসহ যৌথভাবে তুরুগু স্বংয়ের বড় পাথরগুলো অপসারণ করে নৌযান চলাচলের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। জানুয়ারিতে নদীর পানি কমলে এ কার্যক্রম শুরু হবে।