ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের তিন দিনব্যাপী প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু’র প্রথম দিন গতকাল রোববার উদ্যাপিত হয়েছে ‘ফুল বিজু’। এদিন ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফোটার আগেই রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও বান্দরবানের সাঙ্গু নদের তীর জেগে ওঠে এক অনন্য রূপে। শান্ত জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে ওঠে জবা, নীলকণ্ঠ, গাঁদা, গোলাপসহ নানা বুনো ফুলের অপূর্ব সমারোহ। পাহাড়ঘেঁষা এসব জলধারা যেন পরিণত হয় এক বিশাল পুষ্পশয্যায়।
রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, ক্যালেন্ডারের বাংলা বছরের শেষ দুই দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন—এই তিন দিন পাহাড়ে উৎসবের আমেজ থাকে তুঙ্গে। গতকাল ফুল বিজুর মূল আনুষ্ঠানিকতা ছিল হ্রদের জলে ফুল ভাসানো। রাঙামাটি শহরের ডিসি বাংলো এলাকা এবং কেরানী পাহাড়সংলগ্ন হ্রদের পাড়ে দেখা যায় মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পিনন-হাদি এবং বাহারি পোশাকে সজ্জিত হয়ে থালাভর্তি ফুল নিয়ে হাজির হন ঘাটে। পুরোনো বছরের শত গ্লানি মুছে আগমনী নতুন বছরের সুখ-শান্তির প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সেই ফুল জলে ভাসিয়ে দিয়ে তারা পুরোনো বছরের গ্লানি ও অশুভ শক্তিকে বিদায় জানান।
ফুল বিজুর দিনে কাপ্তাই হ্রদের এই বর্ণিল দৃশ্য দেখতে পাহাড়ি জনপদের মানুষের পাশাপাশি সমতলের বহু বাঙালি পর্যটকও ভিড় করেন। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এলাকাটি এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। ফুল ভাসানো শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। শুধু হ্রদ নয়, পাহাড়ের বিভিন্ন ছড়া এবং নদীতেও চলে এই ফুল ভাসানোর উৎসব। সবার মনে একটাই প্রত্যাশা—নতুন বছর নিয়ে আসবে শান্তি ও সমৃদ্ধি।
খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে খাগড়াছড়ি সদরের খবংপুড়িয়া এলাকায় চেঙ্গী নদীর পাড়ে ফুল দিতে বিভিন্ন পাড়ার শত শত চাকমা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সী নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনন-হাদি, গয়না দিয়ে সাজে ও পুরুষেরা ধুতি-ফতুয়া পরে ভিড় জমান। নদীর পাড়ে কলাপাতায় নানা রঙের ফুল এবং মোমবাতি প্রজ্বালন করে গঙ্গা দেবতার কাছে প্রার্থনা করেন। তিন ঘণ্টার বেশি এই উৎসবে সবাই নদীর পাড়ে ফুল দেন। এ সময় ফুলে ফুলে বর্ণিল হয়ে ওঠে চেঙ্গী নদীর পাড়। পানিতে শিশুরা আনন্দ-উল্লাস করে। পরে তারা ঘরবাড়ির আঙিনা সাজায় ফুল দিয়ে।
মিলনপুর এলাকার বাসিন্দা তরুণী অনামিকা চাকমা ও হ্যাপি চাকমা বলেন, ‘ভোরে সকল বন্ধু মিলে পাড়া থেকে বিভিন্ন রকমের ফুল সংগ্রহ করে কলাপাতায় ফুল সাজিয়ে চেঙ্গী নদীর পাড়ে দিয়েছি এবং আগামী দিনের সুখ-শান্তি কামনা করেছি।’
এদিকে বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, বান্দরবান শহরের সাঙ্গু নদে ফুল ভাসিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে পুরোনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করে নিতে শুরু হয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী বিষু উৎসব। রোববার সকালে বান্দরবান শহরের রোয়াংছড়ি বাসস্টেশন-সংলগ্ন সাঙ্গু নদের তীরে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা সবার মঙ্গল কামনায় কলাপাতায় করে ভক্তি শ্রদ্ধাভরে গঙ্গা দেবীর পূজা করেন। পরে দেবীর উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে পুরোনো বছরের গ্লানি ভুলে নতুন বছরের শুভকামনা করেন।