স্বপ্নের ইউরোপে আর যাওয়া হলো না সুনামগঞ্জের ১০ তরুণের। লিবিয়া থেকে রাবারের বোটে করে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে তাঁদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। গত শনিবার তাঁদের মৃত্যুর খবর পরিবারের লোকজন জানতে পারেন। খাবার ও পানির সংকটে সাগরে এমন করুণ মৃত্যুর ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে চলছে মাতম।
সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ওই ১০ তরুণের মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচ, দিরাই উপজেলার চার এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন। ওই নৌকায় বিভিন্ন দেশের ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিল; যার মধ্যে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিহতের এক স্বজনেরা।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া গ্রামের ইজাজুল হক, একই গ্রামের মো. নাঈম, টিয়ারগাঁওয়ের শায়েক আহমেদ, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান ও ইছাগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী।
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের মো. নূরুজ্জামান সরদার ময়না, সাজিদুর রহমান, সাহান এহিয়া ও রাজানগর ইউনিয়নের মুজিবুর রহমান এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের আবু ফাহিম।
স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সূত্রে জানা যায়, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বহনকারী নৌযানটি সপ্তাহখানেক আগে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। নৌযানটি পথ হারিয়ে সাগরেই পাঁচ-ছয় দিন ভেসে ছিল। পথহারা অবস্থায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে অনেকে মারা যান। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের বলে জানা গেছে।
গতকাল রোববার দুপুরে জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামে নিহত নাঈমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে আহাজারি করছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমার ছেলেকে দালাল মেরে ফেলেছে, তোমরা আমার ছেলে রে এনে দাও।’
নাঈমের বাবা দুলন মিয়া বলেন, ‘জগন্নাথপুরের ইছাগাঁও গ্রামের দালাল আজিজুল ইসলামের সঙ্গে গ্রিসে পাঠানোর জন্য ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে জানুয়ারি মাসে লিবিয়া যায় আমার ছেলে। সেখানে যাওয়ার কিছুদিন পর গ্রিসের গেম দেওয়ার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে দালাল। তাঁর দাবি করা টাকা পরিশোধ করার পরও গ্রিসে পাঠাতে টালবাহানা করে। অবশেষে ২১ মার্চ গেম দেওয়া হয়। কথা ছিল গেম দেওয়ার আগে আমাদেরকে জানানো হবে; কিন্তু আমাদের জানানো হয়নি। শনিবার জানতে পারি সাগরে আমার ছেলে মারা গেছে এবং তার লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়েছে।’ এ ঘটনায় তিনি দালালের বিচার দাবি করেন।
একই গ্রামের ইজাজুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিনপতন নীরবতা। এলাকার লোকজন ভিড় করছেন বাড়িতে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা ইজাজুলের পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
ইজাজুলের বাবা সামছুল হক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছাতক উপজেলার শক্তিগাঁও গ্রামের দালাল দুলাল মিয়ার মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে ৩ মাস আগে লিবিয়া গেছে আমার ছেলে। সেখান থেকে গ্রিসে পাঠানোর কথা। সব টাকা পরিশোধ করা হলেও গ্রিসে পাঠানোয় কালক্ষেপণ করতে থাকে দালাল। আমার ছেলে ঈদের আগে ভয়েস বার্তায় জানায়, “দালাল আমাদের খাওয়া-দাওয়া দিচ্ছে না। বড় কষ্টে আছি। দোয়া করও।” এরপর আমার ছেলের সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমরা দালালের সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। এখন শুনি আমার ছেলে মারা গেছে।’
ইজাজুলের আত্মীয় নজরুল ইসলাম বলেন, লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নৌকায় ৪৩ জন ছিল। এর মধ্যে ১৮ জন মারা গেছে। ২৩ মার্চ লিবিয়া থেকে নৌযানটি যাত্রা শুরু করার চার দিন পর গতিপথ হারিয়ে ফেলে। খাবার সংকটে অনেকে মারা যায়। পরে দুর্গন্ধ শুরু হলে লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। নজরুল বলেন, ‘আমরা নৌকায় থাকা একজনের ভিডিও ফুটেজ থেকে মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি।’
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ। তিনি বলেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে এই উপজেলার পাঁচজন মারা গেছেন। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের ইউপি সদস্য সানুর মিয়া বলেন, ‘উপজেলায় নিহত চারজনের তিনজনই আমাদের গ্রামের। তাঁরা দালালের মাধ্যমে প্রায় দুই-আড়াই মাস আগে বাড়ি থেকে বিদেশের উদ্দেশে রওনা দেন। পরে সাগরপথেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।’
চিলাউড়া হলদিপুর ইউপির চেয়ারম্যান মো. শাহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ‘জগন্নাথপুরে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আমার ইউনিয়নের আছে দুজন। তারা সবাই লিবিয়া থেকে গ্রিস যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পথ হারিয়ে ফেলায় সাগরে আটকা পরে তারা। পরে খাদ্যসংকটের কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার বলেন, ‘নৌযানে থাকা জীবিতদের মাধ্যমে যতটুকু জানতে পেরেছি, মৃত অবস্থায় দুদিন নৌযানে থাকার পর যখন দুর্গন্ধ শুরু হয় তখন লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার চারজন আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।’
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আয়েশা আক্তার বলেন, ‘সাগরপথে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের জানা নেই। আমরা শুধু মিডিয়ার মাধ্যমে ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য জেনেছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি।’