কৃষিযন্ত্র চালানোর জন্য তেলের পাম্পে গিয়ে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না পাবনার কৃষকেরা। ফলে ডিজেলসংকটে বেশ বিপাকে পড়েছেন তাঁরা। ফসল উৎপাদন, কাটাই ও মাড়াই কাজে ভোগান্তি ও ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা তাঁদের।
এই অবস্থায় পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ভুক্তভোগী কয়েকজন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে সমস্যার সমাধান না পেয়ে গত রোববার কৃষিমন্ত্রীকে ফোন দেন বলে জানা গেছে। মন্ত্রীও তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু আজ মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি কৃষকদের।
ঈশ্বরদী উপজেলার জাতীয় পুরস্কার পাওয়া কৃষক ময়েজ উদ্দিন ওরফে কুল ময়েজ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, প্রতিটি ফসল আবাদে বর্তমানে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। মাড়াই কাজে হারভেস্টর, জমি চাষ দিতে পাওয়ার টিলার, সেচের জন্য শ্যালো মেশিন, এমনকি ওষুধ ছিটাতেও যন্ত্রচালিত স্প্রে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন ডিজেল। কিন্তু এই যন্ত্রগুলো তো বহন করে তেলের পাম্পে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। যে কারণে কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে ক্যানে (ঢোপ) তেল নিয়ে যেতেন। বর্তমানে ক্যানে তেল দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারির কারণে পাম্প কর্তৃপক্ষ তাঁদের তেল দিচ্ছে না। এতে উপজেলার শত শত কৃষক মহা বিপাকে পড়েছেন।
ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘তেল সমস্যা সমাধানে কিছুদিন হলো উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষকদের চিরকুট (স্লিপ) দিচ্ছিলেন। কিন্তু তাতেও পাম্প কর্তৃপক্ষ তেল দিচ্ছে না। ফলে গত রোববার (২৯ মার্চ) বিকেলে ৪০ থেকে ৪৫ জন কৃষক ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে সমস্যার সমাধান না পেয়ে আমি বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে সরাসরি কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদকে ফোন দিয়ে কথা বলি। পরে মন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি কর্মকর্তাকে কথা বলিয়ে দেই।’
ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘মন্ত্রী তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। পরে সেখান থেকে ইউএনও সাহেবের কাছে গিয়েও বিষয়টি অবগত করি। তিনি বলেছিলেন—কৃষি অফিসার তাঁকে চিঠি দিলে তিনি দেখবেন।’
ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘আজ মঙ্গলবার আবার কৃষি অফিসে গিয়েছিলাম খোঁজ নিতে। কৃষি অফিসার বলেছেন, তিনি ইউএনও সাহেবকে চিঠি দিয়েছেন। ইউএনও সাহেব সেই চিঠি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠাবেন। জেলা প্রশাসক অনুমতি দেওয়ার পর নাকি তেল দেবে। কিন্তু ইউএনও সাহেব কবে জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠাবেন আর কবে সমস্যার সমাধান হবে, বুঝতে পারছি না। আজ বিকেল পর্যন্ত সমাধান হয়নি। কৃষক তেল পাচ্ছে না। ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
কৃষক ময়েজ উদ্দিন আরও বলেন, ‘দেশে কত রকম কার্ড আছে। কিন্তু আমাদের কৃষকদের কোনো তালিকা নেই, কার্ড নেই। যার কারণে আমাদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তেলের ক্ষেত্রেও তা-ই হচ্ছে। একটা কৃষি কার্ড থাকলে সব ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কৃষকদের সমস্যার সমাধান হতো। দ্রুত তেলসংকট সমস্যার সমাধান না হলে ফসল ও কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হবে।’
ভুক্তভোগী কৃষক ঈশ্বরদী পৌর সদরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইস্তা মহল্লার বাসিন্দা আদম আলী বলেন, ‘আমার একটি হার্ভেস্টর, একটি ট্রাক্টর, তিনটি পাওয়ার টিলার, দুটি পাওয়ার স্প্রে ও একটি জমি চাষের আলাদা মেশিন আছে। এই আটটি যন্ত্র ব্যবহার করতে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ লিটার তেল লাগে। কিন্তু এখন এক দিন পর, দুই দিন পরপর ৫০-৬০ লিটার তেল দেয়। সেটা দিয়ে এক দিন চালানোই কঠিন। খুব সমস্যার মধ্যে আছি।’
আরেক কৃষক জাহিদুল ইসলাম ওরফে গাজর জাহিদ বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে মুনাফা লুট করছে। আর সাধারণ কৃষক আমরা আবাদের জন্য তেল পাচ্ছি না। আমাদের কৃষিযন্ত্রগুলো বসে থাকছে। আবাদ বা ফসল কাটা-মাড়াই বন্ধ হয়ে আছে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, কিন্তু এভাবে চললে তো কৃষক বাঁচতে পারবে না।’
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, ‘তিনি (ময়েজ উদ্দিন) কৃষিমন্ত্রী কথা বলবেন বলে ফোন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ফোনের ওপার থেকে সমস্যা সমাধান করতে বলা হয়েছে। আমরা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিয়েছি। তেলের পাম্পগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিছু কৃষক তেল পেয়েছেন। আশা করছি, আগামীকাল বুধবার থেকে সবাই তেল পাবেন।’
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, ‘মূলত ঢোপে তেল নিতে গেলে মোটরসাইকেলচালকেরা বাধা দেন। এতে ভুল-বোঝাবুঝি ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। তবে সমস্যা সমাধানে আমরা ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। কৃষি বিভাগকে বিষয়টি তদারকির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাম্পমালিকদের সঙ্গেও কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। আশা করছি, আর সমস্যা থাকবে না।’