হাওরের পানি বাড়ছেই। এতে নিম্নাঞ্চলের পর এবার উঁচু এলাকার ফসলি জমিও তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে উৎকণ্ঠা আরও বাড়ছে।
তা ছাড়া যেসব পাকা ধান এর মধ্যে তুলতে পেরেছিলেন কৃষক, রোদে না শুকাতে পারায় সেগুলোতে বীজ (অঙ্কুর) গজিয়েছে। তাতে স্তূপ করে রাখা ধান থেকেও চাল পাচ্ছেন না কৃষক।
এই পরিস্থিতিতে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেছেন, এবার সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয়ে কোনো লটারি থাকছে না। কৃষকেরা যত ইচ্ছা তত ধান গুদামে বিক্রি করতে পারবেন। গতকাল রোববার নেত্রকোনায় ধান-চাল কেনার কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় তিনি এসব কথা জানান।
হবিগঞ্জের হাওরের কৃষকদের অভিযোগ, হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও শ্রমিকসংকটের কারণে তুলনামূলক উঁচু এলাকার ধানও সময়মতো কাটতে পারছেন না তাঁরা। এতে করে বাকি ফসলও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অব্যাহত বৃষ্টিপাতের ফলে খলায় রাখা ধানও রক্ষা করা যাচ্ছে না। অনেক স্থানে দেখা গেছে, পানিতে ভিজে ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং ধানের মধ্যে চারা গজিয়ে উঠছে, যা কৃষকদের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার পাল জানান, হাওর ও নন-হাওর মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হবিগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, কুশিয়ারা ও সুতাংয়ের পানি কিছুটা বাড়লেও খোয়াইসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
এদিকে মৌলভীবাজারে পাকা বোরো ধান ঘরে তোলার আগেই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে জেলার হাওরাঞ্চল। হাওর এলাকার কৃষকেরা জানান, কেউ ঋণ করে টাকা এনে, আবার কেউ মহাজনের কাছ থেকে টাকা এনে ধান চাষ করেছিলেন। তবে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব তাঁরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, হাইল হাওর, কেওলার হাওরসহ অনেক এলাকায় বোরো ধান ডুবে আছে।
কৃষক আনু মিয়া, তফাজ্জল হোসেন, আল আমিন, আনোয়ার খাঁন, শওকত আহমদ জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ছয় দিন ধরে হাওর এলাকার বোরো ধান পানির নিচে।
মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরে পানি বেড়েছে। হাওরের পানি যতটুকু সম্ভব নিষ্কাশন করা হচ্ছে, তবে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, জেলায় প্রায় ৩ হাজার ৭১৫ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৩৪৯ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। ১৭-১৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বছর হাওরে ধান অনেক ভালো হয়েছিল। প্রতি হেক্টর জমিতে সাড়ে চার টন থেকে ৫ টন ধান হয়েছিল। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভালোভাবে ধান ঘরে তোলা যায়নি।
এদিকে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সর্ববৃহৎ নলুয়া হাওরসহ উপজেলার ছোট-বড় ১৫টি হাওরের আধা পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, এ বছর জগন্নাথপুরে ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে কৃষকেরা আবার ভোগান্তিতে পড়েছেন।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি]