একটা সময় ছিল, যখন ‘লিটল ম্যাগাজিন’ নামে পরিচিত ছোট কাগজের হাত ধরে বেড়ে উঠত কবি, সাহিত্যিকদের একটা বড় অংশ; বিশেষ করে প্রথা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী তরুণদের আগ্রহের জায়গা ছিল লিটল ম্যাগাজিন। একুশের বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের ‘বহেড়াতলা’ আর ছোট কাগজ হয়ে উঠেছিল প্রায় সমার্থক।
সময়ের আবর্তনে তরুণদের বড় অংশের ভাবনা ও জীবনধারায় পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রকাশনাশিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বড় প্রতিষ্ঠানের আধিপত্যও বেড়েছে। তার ছাপ পড়েছে তারুণ্যের সাহিত্যচর্চায়ও। প্রশ্ন উঠেছে, এই সময়ে এসে ছোট কাগজের চর্চা ও চাহিদা—দুটিতেই কি কিছু ভাটা পড়েছে? হ্যাঁ/না জবাব না মিললেও এবারের বইমেলায় হয়তো কিছু আভাস মিলবে। অবশ্য এক হিসাবে এবারের মেলা এ পর্যন্ত দর্শনার্থীর সংখ্যা, প্রকাশনাসহ সার্বিকভাবেই হতাশ করেছে প্রকাশক, পাঠক, লেখকসহ সবাইকে।
এবারও বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের গাছতলায় সাজানো হয়েছে ছোট কাগজের স্টল। অসমতলভাবে মাটি ফেলে রাখা। লেখক-পাঠকের বসার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আকর্ষণহীন হয়ে আছে প্রাঙ্গণটি। অথচ জায়গাটি কবি ও লেখক-পাঠকের আড্ডায় মুখর থাকার কথা। এর মধ্যে ছোট কাগজের উদ্যোক্তারা তাঁদের প্রকাশনার ডালি সাজিয়ে বসেছেন।
একটি স্টলে হেলাফেলায় পড়ে আছে তাঁদের প্রকাশনাটির কয়েকটি সংখ্যা। আরেক পত্রিকার স্টলে নিতান্ত সাদামাটাভাবে মোটে চারটি সংখ্যা সাজানো। সেখানে স্টলের কর্মীও কেউ নেই। কয়েকটি স্টল একদম খালি পড়ে আছে। কোনো কোনো স্টলে নাম একটি প্রকাশনার, কিন্তু সেখানে বসে আছেন অন্য কাগজের লোকজন। সব মিলিয়ে ছবিটা নৈরাশ্যজনক বললে বেশি বলা হবে না।
থিয়েটার পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র সম্পাদক পাভেল রহমান বলেন, ‘বইমেলায় লিটলম্যাগ চত্বরটি একসময় ছিল মেলার প্রাণ। এখন নানা কারণে চত্বরটি অবহেলার শিকার হচ্ছে। অথচ লিটলম্যাগ হচ্ছে নতুন চিন্তার জায়গা। মেলা কমিটির উচিত চত্বরটি নিয়ে আগে থেকে পরিকল্পনা করা। কয়েকটি লিটলম্যাগের বিষয়ে আমি জানি, স্টল খোলার ব্যাপারে আগ্রহ পায়নি তারা। মেলার সময়সূচি নিয়ে নানান জটিলতার কারণেও অনেক লিটলম্যাগের নতুন সংখ্যা বের হয়নি।’
শহীদ ইকবালের সম্পাদনায় ‘চিহ্ন’ বের হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২০০০ সাল থেকে বের হওয়া ফেব্রুয়ারি সংখ্যাটি তাদের ৫০তম প্রকাশনা। এই সংখ্যায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুসলিম সাহিত্যসমাজের শতবর্ষের বিষয়টি। বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাংলায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও বিকাশে এই গোষ্ঠীর অবদান ও প্রভাব নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ রয়েছে ‘চিহ্ন’র এই সংখ্যায়।
১৯৭২ সাল থেকে লেখক, গবেষক, রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরের সম্পাদনায় বেরিয়ে আসছে ছোট কাগজ ‘সংস্কৃতি’। শুরু থেকে প্রগতিশীল আন্দোলনের নানা বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়েছে এতে। ‘সংস্কৃতি’র স্টলে থাকা বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা নগরের সেক্রেটারি মোহাম্মদ বুরহানের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তাঁদের পাঠক তেমন কমেনি। বুরহান বললেন, ‘একেকটা ছোট কাগজের একেকটা বৈশিষ্ট্য থাকে। তারা একেক মতাদর্শের কথা বলে। আমরা এখনো এক হাজার কপি বের করি। পুরোটাই বিক্রি হয়ে যায়।’
২০১৫ সাল থেকে বের হচ্ছে ছোট কাগজ ‘লেখমালা’। এর জানুয়ারি ২০২৬ সংখ্যার ভূমিকায় লেখা হয়েছে, বারো বছরে মসৃণ ও বন্ধুর—উভয় মেরুতেই বসবাস ছিল লেখমালার। বড় কারণ পুঁজিস্বল্পতা। ‘লেখমালা’র স্টলে ছিলেন কাগজটির সম্পাদক কবি ও লেখক মামুন মুস্তাফা। তিনি বললেন, ‘ছোট কাগজ মূলত বের করেন লেখকেরাই। আগে তাঁদের ভেতরে একটা কঠোর সাধনা, ত্যাগ এবং সততা কাজ করত।
সে কারণে ছোট কাগজগুলোতে সেরা লেখা প্রকাশের জন্য একটা তাগিদ ছিল। এখন সেই ব্যাপারটা নেই। আজকের বদলে যাওয়া সমাজে লেখককে প্রথমে তাঁর প্রাণটা বাঁচাতে হয়। তাই অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও একটা ভালো কাগজ বের করতে পারেন না।’