১০ দিন আগে ধান কেটে আঁটি বেঁধে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। আশা ছিল, সোনালি ধান গোলায় উঠবে। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সেই স্বপ্ন এখন পচে কাদা হয়ে যাচ্ছে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার খয়রত গ্রামের কৃষক মো. ইসরাইল মিয়া (৭৮) এখন সেই পচে যাওয়া আঁটি থেকে চারা গজানো ধান ঝেড়ে আলাদা করার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন। যদি শুকিয়ে পরিবারের জন্য কয়েক দিনের খোরাকটুকু জোগাড় করা যায়—এই আশায়।
ইসরাইল মিয়ার ছেলে এবার সাতকানি জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে চার কানি জমি পুরোপুরি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাকি তিন কানি জমির ধান কাটতে পারলেও বৃষ্টির কারণে মাড়াই করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইসরাইল মিয়া বলেন, ‘দুই দিন ধইরা একটু রইদ দেহা যাইতাছে, শেষ চেষ্টা কইরা দেহি। কিছু ধান শুকায়া ভালো করতে পারলে কয়েক দিনের খোরাক তো অইবো।’
১০-১২ দিন টানা বৃষ্টির পর গত মঙ্গলবার থেকে বুধবার আড়াইটা পর্যন্ত হাওরে রোদের দেখা মেলে। কিন্তু এই রোদ কৃষকের মনে স্বস্তি ফেরাতে পারছে না। ধান শুকানোর এই পেরেশানির মাঝেই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে এনজিওর ঋণের কিস্তি।
কিস্তির টাকা নিয়ে বিড়ম্বনার বিষয়ে খয়রত গ্রামের কৃষক শিব্বির আহমেদ, ‘এনজিও থেকে ঋণ আইন্না খেত করছিলাম। ধান কাটতেই ১৫ হাজার টাকা শেষ। এখন হাতে টাকা নাই, এর মধ্যেই এনজিওর লোক আইসা কিস্তির জন্য চাপ দিতাছে।’
তাঁর স্ত্রী হেনা আক্তার জানান, ‘পপি’ এনজিও থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন তাঁরা। প্রতি মাসে ১১ হাজার টাকা করে কিস্তি দিতে হয়। কিস্তির তারিখ ২০ তারিখ হলেও কিস্তি আদায়কারীরা বুধবারই এসে বলে গেছেন রোববারের মধ্যে টাকা দিতেই হবে। হেনা আক্তার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘পোলাপানরে খাওনই দিতাম পারতাছি না, কিস্তি দিমু কেমনে? হেরার তো এইটা বুঝার দরকার আছিন।’
চায়না বেগম ও হাবিবুর রহমান দম্পতিও একই সংকটে। চার কানি জমির ধান খুইয়ে তারা এখন দিশাহারা। তারা ‘পপি’ এবং ‘ডিএসকে’—উভয় এনজিও থেকে ৯৫ হাজার টাকা করে ঋণ নিয়েছেন। দুই এনজিওর কিস্তিই আগামী রবি ও সোমবারের মধ্যে পরিশোধের আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। চায়না বেগম বলেন, ‘এক-দুই মাস সময় দিলে আমরা আসান পাইতাম। গরিবের লাইগ্যা কেউ নাই।’
একই চিত্র কৃষক আব্দুল বাকি ও তাঁর স্ত্রী বেদেনা আক্তারের। তাঁরা এসএসএস এবং ডিএসকে থেকে মোট ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। কিস্তির টাকা জোগাড় করার দুশ্চিন্তায় তাদের চোখে ঘুম নেই।
এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধর শাখার ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কিস্তি আদায় শিথিল করার কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি। তবে আমরা কৃষকদের জমানো টাকা থেকে কিস্তি সমন্বয় করার পরামর্শ দিচ্ছি, যাতে তাদের হাতে থাকা নগদ টাকায় চাপ না পড়ে।’