ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বইমেলা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় প্রতিবাদস্বরূপ এক দিনের প্রতীকী বইমেলার আয়োজন করেছে একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ। আজ রোববার বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চ চত্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছে এই মেলা। দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ও ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের নেত্রী সংগঠক দীপা দত্ত।
একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক মফিজুর রহমান লালটুর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন পরিষদটির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক প্রকাশক সাঈদ বারী। বক্তব্য দেন সৃজনশীল বই প্রকাশক সমিতি ঢাকার সাধারণ সম্পাদক প্রকাশক দেলোয়ার হাসান ও প্রকাশক সৈয়দ জাকির হোসাইন।
সন্ধ্যায় সমাপনী বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সংগঠনের আহ্বায়ক খোন্দকার শাহ আলম, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর শিকদার লোটন, কবি কামরুজ্জামান ভূঁইয়া প্রমুখ।
ঐতিহ্যের ধারাক্রম রক্ষায় একদল প্রকাশক ঠিকই বইয়ের পসরা সাজালেন। খোলা আকাশতলে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে গুটিকয়েক বইয়ের স্টল স্থাপন করা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অমর একুশে প্রতীকী বইমেলা’।
দীপা দত্ত বলেন, ১৯৬৪-৬৫ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে শুরু হওয়া বইমেলার ঐতিহ্য আজও ধরে রাখার প্রয়াসই এই প্রতীকী আয়োজন। অনুপস্থিত জনসমাগমের মাঝেও প্রকাশকেরা মেলার রঙিন পরিচয় বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যা ভাষা ও সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য অনুপ্রেরণার মতো।
বইমেলাকে ‘বাঙালি সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ’ হিসেবেও উল্লেখ করেন দীপা দত্ত।
সম্প্রতি উদীচী ও ছায়ানটের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে দীপা দত্ত বলেন, আক্রমণের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে দেশে একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা সম্প্রসারিত হওয়ার পর থেকেই মেলার ওপর হামলার ঘটনা শুরু হয়, যা গত বছর থেকে আরও প্রকট হয়েছে।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, বইমেলা শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি জাতির জ্ঞানচর্চা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও আবেগগত সংযোগের প্রতীক।
আবুল কাসেম ফজলুল বলেন, এখন বইমেলা শুধু কবিতা বা উপন্যাসে সীমাবদ্ধ নেই। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান ও জাতীয় জাগরণের নানা বিষয়ে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশিত হচ্ছে, যা দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির সুস্পষ্ট প্রমাণ।
আবুল কাসেম ফজলুল হক আরও বলেন, নির্বাচন ও রোজার সময়সহ নানা বাস্তবতা বিবেচনায় মেলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাস্তবতার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা না হওয়ার একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, দেশের সব কিছু চলতে পারলে শুধু বইমেলা চলতে পারে না, তা বিশ্বাসযোগ্য না। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ভাষার মাসের শুরু থেকেই প্রতিবছর যে বইমেলার পথচলা, সেই মেলা করতে না পেরে বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় নিজেদের কলঙ্কিত করেছে, যা মোচনীয় নয়। আজকে যারা এখানে প্রতিবাদী প্রতীকী বইমেলার আয়োজন করেছেন, তাঁরা জাতির লালিত প্রত্যাশার জায়গাটিকে সত্যিকারভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। যেখানেই সংস্কৃতির আগ্রাসন ঘটবে, সেখানেই এমনিভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে।’
অন্য বক্তারা বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। আমরা চাই, প্রতিবছর পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকেই অনুষ্ঠিত হোক বইমেলা। এর যেন কোনো ব্যত্যয় না ঘটে।’
প্রতীকী বইমেলায় স্টল দিয়েছিল—অন্যপ্রকাশ, কাকলী প্রকাশনী, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, জাগৃতি, নতুন দিগন্ত, আকাশ, সূচীপত্র, আবিষ্কার, বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, অনুপম প্রকাশনী, পাঠক সমাবেশ, অনিন্দ্য প্রকাশ, ছায়াবীথি, কৌমুদী প্রকাশনীসহ আরও বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।
দিনব্যাপী প্রতীকী বইমেলায় একুশের গান, কবিতাপাঠ, বক্তৃতা ও নাটক পরিবেশিত হয়। উদীচী, বিবর্তন, সাভৈসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এতে অংশ নেয়।