ইরানকে আবারও ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন না হলে তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করা হবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই হুমকিকে গতকাল শনিবার প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। এই আলটিমেটামকে ‘অসহায়, অস্থির, ভারসাম্যহীন ও মূর্খতাপূর্ণ কাজ’ বলে অভিহিত করেছে দেশটি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ভাষার প্রতিধ্বনি করে ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, ‘তোমাদের জন্যও জাহান্নামের দ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।’
ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর খাতামুল আম্বিয়ার প্রতিনিধি জেনারেল আলী আবদুল্লাহি আলিয়াবাদির এই প্রতিক্রিয়াটি এমন সময়ে এল যখন ট্রাম্প তাঁর মালিকানাধীন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, যদি কোনো শান্তিচুক্তি না হয় এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া না হয়, তবে ইরানের ওপর ‘নরক নেমে আসবে।’
ইরানের বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের তথ্যমতে, আবদুল্লাহি সতর্ক করে বলেছেন যে ইরানের অবকাঠামোতে মার্কিন বা ইসরায়েলি যেকোনো হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সমস্ত মার্কিন সামরিক সম্পদ এবং ইসরায়েলি অবকাঠামোতে ‘বিধ্বংসী এবং অবিরাম’ হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, ‘ক্রমাগত পরাজয়ের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ও যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট হতাশাজনক, স্নায়বিক, ভারসাম্যহীন এবং বোকার মতো পদক্ষেপে ইরানের অবকাঠামো ও জাতীয় সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দেশের অধিকার এবং জাতীয় সম্পদ রক্ষায় ‘এক মুহূর্তের জন্যও’ দ্বিধা করবে না এবং ‘আগ্রাসনকারীদের তাদের উপযুক্ত শিক্ষা দেবে।’
এর আগে ২৬ মার্চ ট্রাম্প ইরানকে ১০ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন এবং সাম্প্রতিক এই আলটিমেটামটি এসেছে যখন সেই সময়সীমা ৬ এপ্রিল শেষ হতে যাচ্ছে। তাঁর আগের একটি পোস্টে লেখা ছিল, ‘ইরান সরকারের অনুরোধে, এই বিবৃতিটি নিশ্চিত করছে যে আমি জ্বালানি কেন্দ্র ধ্বংসের সময়সীমা ১০ দিন বাড়িয়ে সোমবার, ৬ এপ্রিল রাত ৮টা পর্যন্ত স্থগিত করছি। আলোচনা চলছে এবং ফেক নিউজ মিডিয়া ও অন্যদের ভুল বক্তব্য সত্ত্বেও আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে।’
এর আগে ২১ মার্চও ট্রাম্প একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে ব্যর্থ হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘আঘাত করে নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে দুই দিন পর তিনি সেই হামলা স্থগিত করেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল পরিবহন করা হয়, সেখানে ইরান বর্তমানে কেবল জরুরি এবং মানবিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। শনিবার পর্যন্ত ইরানে ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, অন্যদিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে যথাক্রমে ১৯ ও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। ইরাকে অন্তত ১০৮ জন নিহত হয়েছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতে নিহতের সংখ্যা যথাক্রমে ১২, ৭ ও ৭ জন।
এদিকে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, তারা ইরানি প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির পরিবারের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় সোলেইমানি নিহত হয়েছিলেন।
এর এক দিন আগে তেহরান দাবি করেছিল, তারা একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান এবং একটি এ-১০ গ্রাউন্ড অ্যাটাক বিমান ভূপাতিত করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী তাদের দুই ক্রু মেম্বারের মধ্যে একজনকে উদ্ধার করেছে, তবে অন্যজন এখনো নিখোঁজ। স্থানীয় মেহের নিউজ এজেন্সি শনিবার কোহগিলুয়েহ ও বোয়ের-আহমাদ প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর ফাত্তাহ মোহাম্মদির বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নিখোঁজ বৈমানিককে খুঁজতে সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ‘জনসাধারণ ও উপজাতীয়রা’ কাজ করছে।
অপর দিকে গতকাল শনিবারের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে ইরানের বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছেও একটি আঘাত হানা হয়েছে। যার ফলে ১৯৮ জন কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, দক্ষিণ উপকূলের এই কেন্দ্রে হামলা অব্যাহত থাকলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ঘটতে পারে, যা তেহরানের চেয়ে জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) দেশগুলোর রাজধানীর জনজীবনকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। উল্লেখ্য, বুশেহর কেন্দ্রটি তেহরানের তুলনায় কুয়েত, বাহরাইন এবং কাতারের অনেক বেশি কাছে অবস্থিত।