হোম > বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নজিরবিহীন অস্বাভাবিক উত্তেজনা, মেরামত সম্ভব কি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি। ছবি: সংগৃহীত

কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ-আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিবিদদের চাপের মুখে এই সিদ্ধান্ত দেয় বিসিসিআই। জবাবে গত সোমবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে।

মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া বা তাঁকে খেলতে না দেওয়ার নিষেধাজ্ঞার পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি ভারতের তরফ থেকে। তবে সিদ্ধান্তটি ভারতের প্রধান ক্রিকেট সংস্থার নির্দেশে নেওয়া হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলও ঘোষণা দিয়েছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা ভারতে কোনো ম্যাচ খেলবে না।

ক্রিকেটপাগল এই অঞ্চলে, যেখানে খেলাটি দীর্ঘদিন ধরে ঐক্যের প্রতীক (কিছু ব্যতিক্রম বাদে), এই ঘটনাপ্রবাহ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গভীর টানাপোড়েনকেই তুলে ধরে। ২০২৪ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এসে এই সম্পর্ক বিশেষভাবে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই উত্তেজনার শিকড় প্রোথিত একে অপরের প্রতি দুই দেশের গভীর অবিশ্বাসে। বাংলাদেশের বহু মানুষ মনে করে, ভারত দীর্ঘদিন ধরেই তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে হস্তক্ষেপ করে আসছে। অন্যদিকে ভারতের ধারণা, হাসিনার পতনের ফলে ইসলামপন্থী কট্টর গোষ্ঠী ও ভারতের স্বার্থবিরোধী শক্তিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও কঠোর করেছে। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে, তাঁকে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে এবং বাংলাদেশে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ঢাকার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের একটি আদালত ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে শত শত মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেন।

এর মধ্যেই বাংলাদেশে এক হিন্দু পোশাকশ্রমিককে উত্তেজিত জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। এই ঘটনার পর বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতে উদ্বেগ বাড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী অধিকারকর্মীও নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা জোরদার করেছেন। তাঁদের একজন ওসমান হাদি। তিনি গত মাসে গুলিবিদ্ধ হন এবং কয়েক দিন পর মারা যান। বাংলাদেশ পুলিশ দাবি করেছে, হত্যাকাণ্ডের দুই সন্দেহভাজন ভারতে পালিয়ে গেছেন, যদিও তাঁদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

তবু বাংলাদেশের নির্বাচন একটি সম্ভাব্য ‘অফ-র‍্যাম্প’ বা উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারে। ভারত ইতিমধ্যে জানিয়েছে, নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গে তারা কাজ করতে প্রস্তুত। সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে টানাপোড়েনপূর্ণ হলেও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের জোট ছিন্ন করার পর দলটি এখন নয়াদিল্লির কাছে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

গত মাসে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ছেলে তারেক রহমানকে উষ্ণ সমবেদনা বার্তা পাঠান। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন। এসব পদক্ষেপে সম্ভাব্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি ভারতের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত মিলছে। অন্যদিকে তারেক রহমান, যিনি বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। এটিকে ভারতের প্রতি একটি পরোক্ষ আশ্বাস হিসেবেও দেখা হচ্ছে, তাঁর সরকার বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কাজ করবে।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা কি দুই দেশের জন্যই সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। বাংলাদেশের শক্তিশালী ইসলামপন্থী শক্তিগুলো ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ততা প্রত্যাখ্যান করে। ফলে ঢাকায় নতুন সরকারের জন্য রাজনৈতিক পরিসর সীমিত হতে পারে। বিপরীতে ভারতে মোদির জন্য ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ, তিনি ঘরোয়া রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

লক্ষণীয় যে তারেক রহমানসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা সাম্প্রতিক বক্তব্যে কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। দলের মহাসচিব বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক কেবল ‘সমতার ভিত্তিতেই’ সম্ভব। গত অক্টোবরে তারেক রহমান মন্তব্য করেন, বাংলাদেশিরা ‘সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শীতলই থাকবে। তাই আমাকে আমার দেশের মানুষের পাশেই দাঁড়াতে হবে।’

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি সুযোগ এনে দিতে পারে। তবে তা বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে দুই দেশের সরকার সেই রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে কতটা প্রস্তুত, তার ওপর।

তথ্যসূত্র: ফরেন পলিসি

২০২৫ সালে মোদি-ট্রাম্পের ফোনালাপ হয় ৮ বার, তবু কেন ভেস্তে গেল বাণিজ্য চুক্তি

মার্কিন নেতৃত্বে ‘সম্পদ সাম্রাজ্যবাদের’ নতুন যুগের যাত্রা কি শুরু হলো

ইরানের এবারের বিক্ষোভ কেন অতীতের চেয়ে আলাদা

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানে ভর করে আইএমএফের ঋণ থেকে মুক্তি চায় পাকিস্তান

ভেনেজুয়েলায় ‘গণতন্ত্রী’ মাচাদোর পরিবর্তে মাদুরো–ঘনিষ্ঠ দেলসিকেই কেন বেছে নিলেন ট্রাম্প

ভেনেজুয়েলার তেলের দখল ট্রাম্পের হাতে গেলে পৃথিবীর কী হবে

সহজ যে ৪ ধাপে গ্রিনল্যান্ড কবজা করতে পারেন ট্রাম্প

মাদুরোর মামলাটি যেভাবে ভেস্তে দিতে পারেন তাঁর আইনজীবীরা

মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পরও কেন নিশ্চুপ পুতিন

‘প্রয়োজনের তাগিদে’ তারেক রহমানে আস্থা দিল্লির, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন চায় বিএনপি