হোম > বিশ্লেষণ

১৯৩৮ সালে লন্ডনে মুসলিম শ্রমজীবীদের বিশাল বিক্ষোভের নেপথ্যে কী ছিল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

১৯৩৮ সালের আগস্টে লন্ডনে ভারতীয় মুসলিমদের বিক্ষোভ। ছবি: এক্স

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় অনুভূতি—এই দ্বন্দ্বের ইতিহাস ব্রিটেনে ১৯৮০-এর দশকের ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বা সালমান রুশদি কাণ্ড দিয়ে শুরু হয়েছিল বলে যে ধারণা প্রচলিত, ২০১০-এর পর নতুন ঐতিহাসিক গবেষণা সেটিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। রুশদি বিতর্কের ঠিক ৫০ বছর আগে, ১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে লন্ডনের রাজপথে এইচ. জি. ওয়েলসের একটি বইয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন দক্ষিণ এশীয় শ্রমজীবী মুসলিমরা, যা আজ প্রায় বিস্মৃত এক ইতিহাস।

১৯৩৮ সালের ১৩ আগস্ট। পূর্ব লন্ডনের কমার্শিয়াল রোডের ‘কিং’স হল’-এ সমবেত হয়েছিলেন জমিয়ত-উল-মুসলিমিন নামক একটি ব্রিটিশ মুসলিম সংগঠনের সদস্যরা। এই সংগঠনের সিংহভাগ সদস্যই ছিলেন তৎকালীন লন্ডনের ডক এলাকায় কর্মরত দক্ষিণ এশীয় শ্রমজীবী মানুষ। সেদিনের সেই নিয়মিত সভায় তাঁরা প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক এইচ. জি. ওয়েলসের লেখা ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইটির একটি কপিতে অগ্নিসংযোগ করেন।

তাঁদের অভিযোগ ছিল, ১৯২২ সালে প্রথম প্রকাশিত এই বিশ্ব ইতিহাসের বইটিতে মহানবী (সা.)-এর চরিত্র চিত্রায়ণে অত্যন্ত আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা এরপর ব্যাংক ও ফ্লিট স্ট্রিট হয়ে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল, রয়্যাল কোর্টস অব জাস্টিস এবং বেশ কিছু সংবাদপত্রের কার্যালয় পাশ কাটিয়ে অল্ডউইচের ‘ইন্ডিয়া হাউস’ অভিমুখে এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল করেন। মিছিলটি লন্ডনের শিল্পাঞ্চলীয় পূর্ব প্রান্ত থেকে শুরু হয়ে শহরের মূল কেন্দ্রে পৌঁছে তাঁদের দাবি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেয়।

ওয়েলস তাঁর বইয়ের ‘মুহাম্মদ ও ইসলাম’ নামক একটি বিশেষ অধ্যায়ে মহানবী (সা.) সম্পর্কে বেশ কিছু বিতর্কিত ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। তিনি তাঁকে ‘অত্যন্ত অহংকারী, লোভী, ধূর্ত এবং আত্মপ্রতারক’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেন। যদিও তিনি স্বীকার করেছিলেন যে ইসলাম একটি শক্তিশালী ও অনুপ্রেরণামূলক ধর্ম, তবুও তিনি ধর্মটি সম্পর্কে বেশ কিছু ঢালাও সাধারণীকরণ করেছিলেন। পবিত্র কোরআন সম্পর্কে ওয়েলসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরও কঠোর; তাঁর মতে কোরআন ছিল ‘ঐশ্বরিক গ্রন্থ হওয়ার অযোগ্য’।

কলকাতা থেকে লন্ডন: প্রতিবাদের বৈশ্বিক গতিপথ

মজার বিষয় হলো, লন্ডনের এই প্রতিবাদের সূত্রপাত হয়েছিল ভারতের কলকাতা (তৎকালীন ক্যালকাটা) থেকে। হিন্দুস্তানি ভাষায় অনূদিত ওয়েলসের বইটির আপত্তিকর অংশ নিয়ে ভারতীয় সংবাদপত্রে নিবন্ধ প্রকাশের পর কলকাতায় ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। সেই খবর লন্ডনের ডক শ্রমিকদের কানে পৌঁছালে তাঁরাও প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। পরবর্তীকালে এই বিক্ষোভ পূর্ব আফ্রিকা এবং সিন্ধু প্রদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক একই চিত্র দেখা গিয়েছিল ১৯৮৯ সালে রুশদি বিতর্কের সময়ও—ভারতের সংবাদপত্র থেকে শুরু হওয়া ক্ষোভ পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল।

জমিয়ত-উল-মুসলিমিনের ওই বিক্ষোভে ১৩৬ জন স্থানীয় মুসলিম শ্রমিক স্বাক্ষর করেছিলেন। তাঁরা তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার ফিরোজ খান নূন-এর কাছে একটি পিটিশন জমা দেন। ফিরোজ খান নূন নিজে একজন মুসলিম হিসেবে বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের কাছে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেন।

তবে বইটির দুই প্রকাশক—হাইনম্যান এবং পেঙ্গুইন বুকস—বইটির কোনো অংশে পরিবর্তন করতে বা কোনো বাক্য বাদ দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। যদিও ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অফিস এই সংগঠনটিকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায়নি, তবুও তৎকালীন ভারত বিষয়ক ব্রিটিশ সেক্রেটারি অব স্টেট ফিরোজ খান নূনকে লেখা এক চিঠিতে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য ‘দুঃখ প্রকাশ’ করেছিলেন।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য

১৯৩৮ সালের এই প্রতিবাদটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় মুসলিমরা ব্রিটিশ ম্যাগাজিনগুলোতে (যেমন: এভরি ওম্যান’স ম্যাগাজিন, প্যারেড, মিরর) মহানবী (সা.)-এর চিত্রায়ণের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। এই ঘটনাগুলো ২০০৫ সালের ড্যানিশ কার্টুন বিতর্কের এক আদি সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—কেন ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের অভিজাত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবর্তে এই প্রান্তিক ডক শ্রমিকরাই প্রথম সরব হলেন? লন্ডনের শিল্পাঞ্চলীয় দরিদ্র এলাকা থেকে রাজকীয় পশ্চিম প্রান্তে এই পদযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল এক প্রকারের সাংস্কৃতিক স্বাধিকার ঘোষণা।

রুশদি কাণ্ডের অনেক আগেই এই শ্রমিকেরা প্রমাণ করেছিলেন, জনসমক্ষে কথা বলার সুযোগ না থাকলেও তাঁরা বিকল্প উপায়ে তাঁদের দাবি আদায় করতে এবং সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ডে দাঁড়িয়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংবেদনশীলতার জানান দিতে জানতেন। ১৯৩৮ সালের এই বিস্মৃত অধ্যায়টি বর্তমান বিশ্বের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যকার জটিল সম্পর্ককে এক গভীর ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: হাফিংটন পোস্ট

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সমান্তরালে চীনেরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ঢাকা

ভারতের সঙ্গে সামরিক ভারসাম্যে গেমচেঞ্জার হবে পাকিস্তানের স্টিলথ ‘হাঙর’ সাবমেরিন

জানাজা কূটনীতি: কোরআন থেকে দেশ ও সংগঠনগুলোকে বার্তা দিল ইরান, কার জন্য কোন আয়াত

চীনে বিনোদন তারকাদের ওপর কেন ক্ষোভ বাড়ছে, কনসার্ট বাতিলে কেন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ

ইরান যুদ্ধের পর সৌদি নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অক্ষশক্তি

ট্রাম্পের ৫০ কোটি ডলার মুনাফা: যেভাবে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল পাকিস্তান

আল-জাজিরার চোখে মেসি-ম্যারাডোনার দেশ নিয়ে বাংলাদেশিদের উন্মাদনা

২ লাখ ২৯ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে নতুন ব্রিটিশ-মার্কিন চুক্তি

ইসরায়েলের নতুন টার্গেট তুরস্ক ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ অক্ষ, কী করবে মধ্যপ্রাচ্য

ম্যারাডোনা থেকে মেসি: বাংলাদেশিরা আর্জেন্টাইন ফুটবলার কেন এত বেশি পছন্দ করে