হোম > বিশ্লেষণ

ইরান ও ইসরায়েলের উত্থানের মুখে দিশা পাচ্ছে না সৌদি আরব

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সামনে এক ভয়াবহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ছবি: এএফপি

ছয় সপ্তাহ ধরে চলা ইরানের ওপর আরোপিত ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবের সংযম অনেককে বিস্মিত করেছে। শুরুর পরপরই যুদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দেশগুলোর অবকাঠামোতে ইরানের পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পাল্টা অবরোধ কয়েক দশক ধরে চলা নিরাপত্তাকাঠামো ভেঙে দেয়। এই নিরাপত্তাকাঠামোই একসময় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থানকে সম্ভব করেছিল।

যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরব মার্কিন বাহিনীকে তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলেও তারা সরাসরি ইরানি হামলার জবাব দেয়নি। রিয়াদ সংক্ষিপ্ত কূটনৈতিক সতর্কবার্তা দিয়েছে, কিন্তু আরব আমিরাতের মতো সরাসরি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়নি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধাভিযানে যোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। আবার ওমান ও কাতারের মতো ইরানের সঙ্গে সক্রিয় কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ায়নি। তবে নীরবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেছে।

রিয়াদের এই অবস্থান দীর্ঘদিনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশলেরই সম্প্রসারণ। সৌদি আরব শক্তিশালী ইরানকে ভয় পায়। দুই দেশ ২০১৬ সালে সম্পর্কচ্ছেদ করে। পরে চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়। কিন্তু এর পর থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও সমান আশঙ্কার চোখে দেখতে শুরু করে। সৌদি আরব চায় না, ইরান বা ইসরায়েল কেউই আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি হয়ে উঠুক। এই যুদ্ধ রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সদ্য গড়ে ওঠা সমঝোতায় ধাক্কা দিয়েছে। তবে কোনো পক্ষই সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ুক, তা চায় না।

এখন পর্যন্ত রিয়াদ অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণের নীতি নিয়েছে। তারা ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে আগ্রহী। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ফল হিসেবেই এই যুদ্ধবিরতি হয়। রিয়াদ সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে হুতিদের হামলার ঝুঁকি বাড়বে, যা লোহিতসাগর হয়ে যাওয়া সৌদি তেল রপ্তানিকে বিপদের মুখে ফেলবে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা জানে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি ভরসা করা যায় না। যদি ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়ায়, তবে রিয়াদ যুদ্ধে প্রবেশ করতে পারে।

তবে সংঘাত যেভাবেই শেষ হোক, সৌদি আরব জানে—তাদের অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা তাদেরই করতে হবে। তারা হয়তো কিছুটা সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকবে, কিন্তু পাশাপাশি মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে আঞ্চলিক জোট আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়াবে। একই সঙ্গে যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের সঙ্গেও নতুন সমঝোতা খুঁজতে হবে। যদি তারা এটি করতে পারে এবং আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) সব দেশকে নিজ অবস্থানের পেছনে একত্র করতে পারে, তবে যুদ্ধ শেষে সৌদির আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব কমে যাওয়ার বদলে বরং বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।

ভারসাম্যহীন এক বাস্তবতা

সৌদি আরব সব সময়ই চেয়েছে দুর্বল ও নিয়ন্ত্রিত ইরান। যে কিনা কখনোই রিয়াদের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর সৌদি আরব উদ্বেগ নিয়ে দেখেছে, আরব বিশ্বে ইরানের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে, ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহে ইরানের সমর্থন রিয়াদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। যার ফলে তারা সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ায়। ২০১৬ সালে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে জনতার হামলার পর দুই দেশের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। তিন বছর পর, ২০১৯ সালে, ইরানের ইন্ধনে হুতিরা সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। ফলে, সাময়িকভাবে দেশটির অর্ধেক তেল উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং সংঘাত আরও গভীর হয়।

এই সরাসরি হামলা সৌদি নেতৃত্বকে হতবাক করে। কিন্তু তারচেয়েও বেশি ধাক্কা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে অংশীদারকে রক্ষা ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন দৃঢ় জবাব দেয়নি। এই অভিজ্ঞতা রিয়াদকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা যাবে না। ফলে তারা নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ায়, পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের হুমকি দেয় এবং বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। একই সময়ে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথও খুঁজতে থাকে।

এরপর, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে হামলা এবং এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের ব্যাপক সামরিক হামলা সৌদি আরবের সামনে এক নতুন বাস্তবতা হাজির করে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্বশর্ত। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সেই স্বাভাবিকীকরণকে অন্তত স্বল্প মেয়াদে রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব করে তোলে। একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলকে এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত করে, যা কিনা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিজ স্বভাবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সৌদি আরব ইরানকে ভয় পায়, কিন্তু একই সঙ্গে এমন একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থায় নিজেকে আটকে ফেলতেও রাজি নয়, যা পুরোপুরি ইসরায়েল নির্ধারণ করে দেবে। বিকল্প বাড়াতে গত বছর তারা পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তিই পরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক জোটের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই জোটে মিসর ও তুরস্ক যুক্ত হচ্ছে বলা জানা যাচ্ছে। লক্ষ্য—ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের দিক থেকেই সৌদি স্বার্থের প্রতি সম্ভাব্য হুমকি ঠেকানো ও নিয়ন্ত্রণ করা। এই সমন্বয়ই বর্তমান সংঘাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পথ তৈরি করে। চার দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধের পরই তা পূর্ণাঙ্গ বহুপক্ষীয় অক্ষে রূপ নেয়।

রিয়াদ এই যুদ্ধ না চাইলেও বুঝতে পারে, নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি তেমন কোনো ফায়দা দেবে না, বরং তা আরও দফায় দফায় সংঘর্ষের পথ খুলে দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ইরানের যুদ্ধপূর্ব নেতৃত্বের পতন ঘটায় এবং তার জায়গায় আরও কঠোর ও যুদ্ধবাজ নেতারা উঠে আসেন। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই যুদ্ধ ব্যবস্থাপনায় কোনো সুসংহত কৌশল প্রকাশ করেনি কিংবা ইরানের পাল্টা আক্রমণ থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কার্যকরভাবে সুরক্ষাও দিতে পারেনি। ফলে সংঘাতপরবর্তী নিরাপত্তা পুনর্গঠনে ওয়াশিংটনের ওপর রিয়াদের আস্থা কমে গেছে।

জিসিসির দেশগুলোও এ যুদ্ধ নিয়ে একক অবস্থান নেয়নি। সৌদি আরব নিজেকে মাঝামাঝি অবস্থানে রেখেছে। একদিকে, সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখা ওমান ও কাতারের সঙ্গে থেকেছে এবং যুদ্ধ শেষে ইরানের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে বাহরাইন ও আরব আমিরাতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছে, যারা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানকে দুর্বল বা ভেঙে ফেলার জন্য উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদির পার্থক্যটি স্পষ্ট—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার দিনই আমিরাত ইরানের দুটি তেল স্থাপনায় হামলা চালায়।

ভবিষ্যতের টানাপোড়েন

সৌদি আরবের মূল অগ্রাধিকার হলো এমন কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়া, যা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তবে যদি ইরান তাদের অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে রিয়াদ যুদ্ধে জড়াতে পারে। একইভাবে, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যদি পূর্ণমাত্রায় ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে, সেটিও সৌদি আরবের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

কিন্তু যুদ্ধে অংশ নেওয়া সৌদি আরবকে এমন এক অবস্থায় ঠেলে দিতে পারে, যেখানে ফিলিস্তিন ইস্যুতে অর্থবহ কোনো ছাড় না পেয়েই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু ফিলিস্তিন ইস্যু সৌদি জনগণ ও বৃহত্তর আরব বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব মনে করে, ইসরায়েল এই যুদ্ধকে ব্যবহার করছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে এবং ইরান ও সৌদি আরবকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আটকে রাখতে। এর মাধ্যমে ইসরায়েল তার আধিপত্য আরও সুদৃঢ় করতে চায় এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেবল তেল উৎপাদক রাষ্ট্রে পরিণত করে তাদের কৌশলগত গুরুত্ব কমিয়ে দিতে চায়।

যদি সৌদি আরব নিরপেক্ষ থেকেও যায় এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়, তবু দেশটির সামনে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আহত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী এক ইরান তার প্রতিবেশী ও পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে থাকতে পারে। পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা তখনো বহাল থাকবে।

তেহরানের দৃষ্টিতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা ভবিষ্যৎ সহযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করবে না। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে জানায়, ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ব্যবহার করতে দেবে, তাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে ইরান শুধু সেই হুমকিই বাস্তবায়ন করেনি, বরং জ্বালানি অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।

ইরানের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তারা যে বার্তা দিতে চেয়েছে—তার তুলনায় নগণ্য। বার্তাটি হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট গড়ে তুললেও উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তাদের বিশ্বাস, যুদ্ধ শেষে উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝবে যে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে হলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জরুরি।

এ ছাড়া, ইরান উপলব্ধি করেছে যে—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ আগ্রাসন ঠেকাতে একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার হতে পারে। তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এখন প্রায়ই বলা হচ্ছে, ইরান যদি আগে থেকেই এই ‘হরমুজ কার্ড’ ব্যবহার করত, তাহলে হয়তো দেশটিকে কখনোই নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের মুখে পড়তে হতো না। একই সঙ্গে, হরমুজ প্রণালিকে সম্ভাব্য রাজস্বের উৎস হিসেবেও দেখা হচ্ছে; যেমনটা সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য মিসর নেয়।

মার্কিন অবরোধ শুরুর আগে, ইরান ধারণা দিয়েছিল যে—তারা ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা করতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে তেহরান পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রবেশাধিকার সীমিত করতে পারত (এমনকি অবরোধ ভেঙেও দিতে পারত) এবং প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ছাড় আদায় করতে পারত। একই সঙ্গে তারা এটাও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, চীন রিয়াদ ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল, সেটিকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। কিন্তু রিয়াদ এমন একটি পরিস্থিতি এড়াতে আগ্রহী, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়।

বন্ধুত্বের জটিলতা

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আধিপত্য মেনে নেওয়া অথবা ইরানের চলমান হুমকি মেনে নেওয়ার মতো দুটি অপছন্দনীয় বিকল্পের মুখোমুখি হয়ে রিয়াদ নতুন জোট গঠনের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকে। এই বৈঠকের ফলেই পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসে।

এই প্রক্রিয়া শুধু যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সৌদি আরবের স্বার্থ রক্ষা করে না, বরং তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তি থেকে রিয়াদকে বাদ পড়া থেকেও রক্ষা করে। আর যদি এই চার দেশের সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয়, তাহলে তা সৌদি আরবকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বাইরে কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে। মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্ক—এই তিন দেশেরই বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে। আছে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত অস্ত্রভান্ডার। পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে আর তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য।

এটা স্পষ্ট যে, রিয়াদ ওয়াশিংটনের বাইরে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে এবং তারা আশা করছে, চারটি দেশ একসঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে প্রভাব ফেলতে পারবে, তা একা সৌদি আরবের পক্ষে সম্ভব নয়। ওয়াশিংটনের অনিশ্চয়তায় অসন্তুষ্ট অন্যান্য শক্তির কাছ থেকেও—যেমন কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলো—তারা প্রতিরক্ষামূলক ড্রোন সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করতে পারে। তারা ইতিমধ্যেই সেই পথে হাঁটছে। মার্চের শেষ দিকে ইউক্রেন সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার মাধ্যমে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ড্রোন প্রযুক্তি সংযুক্ত করতে সহায়তা করা হবে। আর যদি এই চার দেশ প্রতিরক্ষা প্রতিরোধে তাদের সহযোগিতা জোরদার করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় সৌদি আরব আরও প্রস্তুত থাকবে এবং লেবানন বা গাজার মতো অন্যান্য ক্ষেত্রেও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিতে পারবে।

সৌদি আরবকে উপসাগরীয় নিরাপত্তার জন্য নিজেদের কাঠামোও কল্পনা করতে হবে, যেখানে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশ ও এই চার দেশকে একত্র করে উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির পক্ষে সমর্থন জোগাড় করতে হবে। ইরান চাইবে, সৌদি আরব যেন নিশ্চিত করে যে—তার ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে না। অন্যদিকে, সৌদি আরব চাইবে নিশ্চয়তা—তাদের ভূখণ্ড আর ইরান বা তার মিত্রদের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য হবে না। এমন একটি অনাক্রমণ চুক্তি কার্যকর করতে হলে সৌদি আরবকে জিসিসিকে একটি সত্যিকারের বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিনিয়োগ করতে হবে, যা তার সব সদস্যের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম এবং এ ধরনের চুক্তিতে সেইসব জিসিসি রাষ্ট্রের জন্যও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে, যারা একই চুক্তি নেবে।

ওমান ও কাতার ইতিমধ্যে ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার এমন একটি মডেল অনুসরণ করেছে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধে তাদের ভূখণ্ড তেমন কোনো ইরানি হামলার শিকার হয়নি। অন্যান্য জিসিসি রাষ্ট্রও সেই পথ অনুসরণে আগ্রহী হতে পারে। অবশ্যই সৌদি আরব যদি মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এবং যুদ্ধপরবর্তী ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে ইসরায়েল সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখতে পারে। কিন্তু যদি এই চার দেশের জোট আরও কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং ইরান-সৌদি অনাক্রমণ চুক্তি গড়ে ওঠে, তাহলে তা ইসরায়েলের জন্যও উপকারী হতে পারে। কারণ, এতে ইরান ও তার মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে এবং ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথও পরিষ্কার হতে পারে।

রিয়াদ তেহরানের নতুন নেতৃত্বকে গভীর অবিশ্বাসের চোখে দেখে। তাদের আরও কড়া ও বিভক্ত মনে করে। ফলে একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গঠনে তারা খুবই অনিশ্চিত অংশীদার। কিন্তু ইরান ও সৌদি আরব চিরকাল প্রতিবেশীই থাকবে। ভূগোল তাদের বিকল্প কোনো সুযোগ দেয় না। ইতিবাচক সহাবস্থানের বিকল্প হলো একটানা সংঘাতের চক্র, যা শেষ পর্যন্ত ইরান ও উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো—সবার জন্যই ধ্বংস ডেকে আনবে।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

আরও পড়ুন:

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে অন্যতম বড় বাধা ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর

বিশ্বশান্তি রক্ষায় ব্যস্ত ইসলামাবাদ: পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্দরে চলছে অন্য খেলা

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা অনিশ্চিত, ইরানে কি ফের ‘অতর্কিত হামলা’

মধ্যপ্রাচ্যে ‘সিসিফাসের ফাঁদে’ যুক্তরাষ্ট্র, তবু ইরান যুদ্ধে কেন নেপথ্যে খেলোয়াড় চীন

রয়টার্সের বিশ্লেষণ: ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় ইরানিরা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নীরব যুদ্ধ: ৫ বিলিয়ন ডলারের পেস্তাবাদামের বাজার দখলের লড়াই

নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভ: ভারতের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হয়ে ওঠার স্বপ্ন কি চ্যালেঞ্জের মুখে

শুধু ইরান নয়, আরও বহু দিকে হারছেন ট্রাম্প

ইরানি সেনার কাঁধে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রেই থমকে যেতে পারে মার্কিন বিমান হামলা

দুপক্ষই জিতবে—যেভাবে এমন চুক্তির পথে হাঁটতে পারে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র