হোম > বিশ্লেষণ

‘রামরাজ্য’ কেমন ছিল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রামায়ণের একটি প্রতীকী ছবি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

ভারতের রাজনীতিতে ‘রামরাজ্য’ এখন বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে প্রায়ই এই ধারণার উল্লেখ করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। তবে বাল্মীকি রামায়ণে বর্ণিত রামরাজ্য আসলে কেমন ছিল? সেখানে ন্যায়বিচার, শাসকের দায়িত্ব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? সমসাময়িক ভারতীয় বাস্তবতার সঙ্গে এসব প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

রামায়ণে লঙ্কাকাণ্ডের শেষে রাম অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন। সেখানে তাঁর শাসনামলকে আদর্শ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রামায়ণে একটি শ্লোক আছে, ‘যত্র রামো ভয়ং নাস্তি তত্র নাস্তি পরাজয়ঃ’ (যেখানে রাম, সেখানে ভয় নেই, পরাজয়ও নেই)। অর্থাৎ, রামের রাজত্বে মানুষ রোগব্যাধির ভয় থেকে মুক্ত ছিল। বিষধর সাপের ভয় ছিল না। কোনো বৃদ্ধকে নিজের সন্তানের শেষকৃত্য করতে হয়নি। বিধবাদের কান্না শোনা যেত না। সবাই দীর্ঘায়ু লাভ করত, গাছে সারা বছর ফল ও ফুল ধরত, সময়মতো বৃষ্টি হতো এবং আবহাওয়া ছিল মনোরম।

মানুষ ধর্মপরায়ণ ছিল এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করত। কেউ অন্যের ক্ষতি করত না। তবে রাম কীভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন বা শাসক হিসেবে কী ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতেন, সে বিষয়ে এই অংশে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।

রামরাজ্যে বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া যায় উত্তরকাণ্ডে বর্ণিত শম্বুকের ঘটনায়।

এক ব্রাহ্মণ শিশুর অকালমৃত্যুর পর তার বাবা রাজা রামকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে কোনো গুরুতর ধর্মলঙ্ঘন না ঘটলে এমন মৃত্যু সম্ভব নয়। এরপর ঋষি নারদ রামকে জানান, এক শূদ্র তপস্যা করছেন এবং সেটিই এই অকালমৃত্যুর কারণ। কারণ সে সময়ের বর্ণব্যবস্থা অনুযায়ী শূদ্রদের তপস্যা করার অধিকার ছিল না।

এরপর রাম নিজে শম্বুককে খুঁজে বের করেন এবং কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই তাঁর শিরশ্ছেদ করেন। এরপরই মৃত ব্রাহ্মণ শিশুটি পুনরুজ্জীবিত হয় বলে রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে বহু শতাব্দী ধরে বিতর্ক রয়েছে। নিম্নবর্ণের বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই ঘটনার সমালোচনা করে আসছেন। তাঁদের মতে, শম্বুককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এতে উচ্চবর্ণের স্বার্থ রক্ষাই বিচারব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তবে উত্তরকাণ্ডের আরেকটি ঘটনায় রামরাজ্যের বিচারব্যবস্থার ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। অনেক গবেষকের মতে এই অংশটি পরবর্তী সংযোজন (প্রক্ষিপ্ত) হলেও তা রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে স্থান পেয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, রামরাজ্যে কারও কোনো অভিযোগ ছিল না। ফলে রাম নিয়মিত লক্ষ্মণকে পাঠাতেন, কেউ বিচার চাইছে কি না তা জানার জন্য। একদিন লক্ষ্মণ একটি আহত কুকুরকে খুঁজে পান। কুকুরটি জানায়, কোনো কারণ ছাড়াই এক ব্রাহ্মণ সন্ন্যাসী তাকে মারধর করেছেন।

রামের সভায় হাজির হয়ে কুকুরটি প্রথমে শাসকের দায়িত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দেয়। এরপর অভিযুক্ত ব্রাহ্মণ সর্বার্থসিদ্ধকে ডেকে আনা হয়। সর্বার্থসিদ্ধ নিজেই অপরাধ স্বীকার করেন।

এরপর রাম যখন কুকুরটির কাছে জানতে চান, অপরাধীর কী শাস্তি হওয়া উচিত, তখন কুকুরটি এক বিস্ময়কর প্রস্তাব দেয়। সে বলে, অভিযুক্ত ব্রাহ্মণকে কালঞ্জরের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান করে দেওয়া হোক।

রাম সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর করেন।

রামের মন্ত্রীরা এতে বিস্মিত হন। কারণ তাঁদের কাছে এটি শাস্তি নয়, বরং পুরস্কার বলে মনে হয়েছিল। তখন কুকুরটি নিজের পূর্বজন্মের কাহিনি তুলে ধরে।

উত্তরকাণ্ডের এই দুটি ঘটনা রামরাজ্যের বিচারব্যবস্থার দুটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। একদিকে, একজন শূদ্র কোনো বিচার ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড পান। অন্যদিকে, একটি কুকুরও রাজদরবারে নিজের অভিযোগ জানানোর সুযোগ পায় এবং তার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়।

রামায়ণের এসব ঘটনা বর্তমান সময়েও নানা প্রশ্ন উত্থাপন করে। আজকের সমাজে ন্যায়বিচারের অধিকার কার? কেবল মানুষের, নাকি অন্যান্য প্রাণীরও? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি সম্মানের বিষয়, নাকি বিশাল দায়িত্ব?

আর যে রামের নাম বহু মানুষের কাছে সাহস ও নির্ভয়ের প্রতীক, সেই রামের কোন রূপকে বর্তমান সমাজ অনুসরণ করবে—ভয় দূর করার রামকে, নাকি এমন এক রামকে, যাঁর নাম অনেকের মধ্যে ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে?

বর্তমান সময়ে রামায়ণের এই শিক্ষাগুলো ভারতের শাসক ও ধর্মীয় নেতাদের আত্মদর্শনের আয়না হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এখনো বর্ণপ্রথার কারণে মানুষ নির্যাতিত হয়। সরকার কর্তৃক নিযুক্ত ব্যক্তিরা চুরি করে মন্দিরের দানবাক্সের টাকা। এরপরও যাঁরা এই কলিযুগে ভারতকে রামরাজ্য বানাতে চান, তাদের জন্য শুভকামনা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, হবু রামরাজ্যের বিচারব্যবস্থা যেন শম্বকু আর সেই কুকুরের মতো না হয়। এটি যেন হয় ‘যত্র রামো ভয়ং নাস্তি তত্র নাস্তি পরাজয়ঃ’।

‘দ্য ওয়্যার’-এ প্রকাশিত দিল্লির সেন্ট স্টিফেনস কলেজের শিক্ষক ও ইতিহাসবিদ নয়না দয়ালের মতামত থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা।

ইসরায়েলিরা আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসে, কিন্তু আর্জেন্টাইনরা কি তাদের ভালোবাসে

ভূরাজনৈতিক সংঘাতে কেন সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে ডিজেল

উত্তর প্রদেশে নামবদলের রাজনীতি: যেভাবে মুসলিম ঐতিহ্য মুছে দিচ্ছেন আদিত্যনাথ

বিশ্বকাপ ফাইনাল: হেভি মেটাল বনাম নিখুঁত অর্কেস্ট্রার লড়াইয়ে জিতবে কে

ডোনাল্ড ট্রাম্পই কি সর্বশেষ মার্কিন জায়োনিস্ট প্রেসিডেন্ট

চীনের ৫০০ স্টেলথ যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ভারতের শূন্য, ব্যবধান ঘোচাতে পারবে দিল্লি?

জ্বালানি ও বিনিয়োগের বিনিময়ে কুয়েতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করছে পাকিস্তান

মাঠের বাইরে মেসির অন্য সাম্রাজ্য: বিলাসবহুল হোটেল থেকে পোশাক সব খাতেই বিপুল বিনিয়োগ

বিশ্বকাপ আয়োজনে সর্বাধিক মুনাফা করল কারা, লোকসান গুনল যারা

ইউক্রেনের সামরিক নেতৃত্বে গভীর ফাটল, আমলাতন্ত্রের লড়াইয়ে ঝুঁকিতে জেলেনস্কি