চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন ধরেই বলা হয় ‘আয়রন ব্রাদার্স’ বা লৌহভ্রাতা। ধর্ম, রাজনৈতিক আদর্শ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিক থেকে একেবারেই ভিন্ন এই দুটি দেশ। একদিকে কমিউনিস্ট ও নাস্তিক চীন, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান। তবু গত ৭৫ বছরে তাদের সম্পর্ক এমন এক কৌশলগত বন্ধনে পরিণত হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
দীর্ঘ এই সম্পর্কের মধ্যে ১৯৬৩ সালের মার্চে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে একটি সীমান্ত চুক্তি করেছিল এবং কারাকোরাম অঞ্চলের শাকসগাম উপত্যকার প্রায় ৫,১৮০ বর্গকিলোমিটারের নিয়ন্ত্রণ বেইজিংয়ের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু ভারত এই অঞ্চলকে কাশ্মীরের অংশ হিসেবে দাবি করে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান মনে করেছিল, বিতর্কিত এই অঞ্চলে চীনের উপস্থিতি ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করবে।
৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইসলামাবাদ ও বেইজিং আবারও তাদের ‘অল-ওয়েদার ফ্রেন্ডশিপ’-এর কথা বলছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্প্রতি সংসদে চীনের সঙ্গে ‘অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’ ও ‘অটুট ভ্রাতৃত্বের’ কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাচ্ছেন।
তবে এই সম্পর্কের ইতিহাস শুধু বন্ধুত্বের নয়। এর ভেতরে রয়েছে কৌশল, গোপন সমঝোতা এবং যৌথ নিরাপত্তা স্বার্থের দীর্ঘ অধ্যায়।
পাকিস্তান ১৯৫০ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম দেশগুলোর একটি। পাকিস্তানের জন্য এটি আদর্শিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বেশি ছিল কৌশলগত পদক্ষেপ। স্বাধীনতার পরপরই ভারতকে মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী মিত্রের প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানের। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সিয়াটো ও সেন্টোতে যোগ দিলেও, ইসলামাবাদ একই সঙ্গে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতবিরোধী অভিন্ন স্বার্থই দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘ভারতকে ঘিরে অভিন্ন উদ্বেগ না থাকলে পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিত।’
এই সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের একটি হলো পারমাণবিক সহযোগিতা। ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা দেন, পাকিস্তানও যে কোনো মূল্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করবে। পরবর্তী সময়ে চীন পাকিস্তানকে প্রযুক্তি, নকশা ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরবরাহে সহায়তা করেছে বলে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বহু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যদিও দুই দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে তা অস্বীকার করে।
১৯৯৮ সালে পাকিস্তান যখন চাগাই পাহাড়ে পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তখন জাতিসংঘে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় চীন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর হয়।
১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ঐতিহাসিক যোগাযোগ স্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল পাকিস্তান। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফরের মধ্যস্থতাকারী ছিল ইসলামাবাদ। এই উদ্যোগ পরবর্তীতে রিচার্ড নিক্সনের চীন সফরের পথ খুলে দেয় এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে বড় পরিবর্তন আনে।
দুই দেশের সম্পর্কের আরেকটি বড় প্রতীক হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)। প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্প চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলকে পাকিস্তানের গওয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ৬২ বিলিয়ন ডলারের এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করলে পাকিস্তানে এটিকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলা হয়।
তবে বাস্তবে সিপিইসি প্রত্যাশামতো অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও, পাশাপাশি বেড়ে ঋণের বোঝা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা এখন চীন। বর্তমানে পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণের প্রায় ২২ শতাংশই চীনের কাছে।
নিরাপত্তা সংকটও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলায় গত কয়েক বছরে অন্তত ২০ জন চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন। ফলে বেইজিং এখন ‘নিরাপত্তা আগে, অর্থনীতি পরে’ নীতিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এখন চীন থেকে আসে। যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—সবখানেই চীনা প্রযুক্তির প্রভাব বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ৭৫ বছর পর পাকিস্তান-চীন সম্পর্ক এখন আর শুধু আবেগ বা বন্ধুত্বের নয়। এটি গভীর কৌশলগত নির্ভরতার সম্পর্ক। পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনীতিতে উভয় দেশই একে অপরকে এখনো প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে দেখছে।