হোম > বিশ্লেষণ

দ্য স্ক্রলের নিবন্ধ

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: বিজেপি কেন আর বাংলাদেশবিরোধী বয়ান দিচ্ছে না

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বাংলাদেশে এক হিন্দু ব্যক্তির গণপিটুনির শিকার হয়ে মৃত্যুর প্রতিবাদে কলকাতায় বিজেপির বাংলাদেশ উপ–দূতাবাস অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল। ছবি: এক্স

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী গত বছরের ডিসেম্বরে কলকাতায় একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। এসব বিক্ষোভ ছিল বাংলাদেশি হিন্দু দীপু চন্দ্র দাসের ‘লিঞ্চিংয়ের’ প্রতিবাদে। ‘দীপু দাসের রক্ত বিচার চায়’—এমন টুইটও করেন শুভেন্দু। সঙ্গে তিনি একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের সামনে হিন্দু সন্ন্যাসীদের নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রণাম করছেন তিনি।

এই বিক্ষোভগুলো ছিল ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ভারতের পূর্ব সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে তথাকথিত সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছিল দলটি। গেরুয়া শিবিরের দাবি—বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের যে দুর্দশা, তা পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুদের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। তাদের দাবি ‘জনমিতিক এই পরিবর্তন’ বন্ধ না হলে পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুদের এই দশা হবে।

কিছু সময়ের জন্য মনে হচ্ছিল, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপি তাদের মূল নির্বাচনী ইস্যু খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক বার্তায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দলটির প্রচারণা মূলত পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি ও অপরাধ তুলে ধরা এবং নানা ধরনের নগদ সহায়তা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ। এমনকি এখনো বিজেপির যারা তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে কথা বলে, তখনো বাংলাদেশের নাম সরাসরি উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকেন।

এতে বিজেপি ও আরএসএসের হিন্দুত্ববাদী কর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ হতাশ হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারেক রহমানের বিজয়ের পর নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস হওয়ায় মোদি সরকার তাঁর সরকারের প্রতি নরম অবস্থান নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারছে না পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি। বিজেপি নেতারা স্বীকার করছেন, দলটি বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য কিছুটা কমিয়েছে, তবে এটিকে তাঁরা স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন।

বিজেপির জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং হিন্দুত্ববাদী থিংক ট্যাংক শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অনির্বাণ গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন হিন্দুরা নির্যাতনের মুখে পড়ছিল, তখন আমরা আক্রমণাত্মক ছিলাম। এখন নতুন সরকারের অধীনে সেই ধরনের নির্যাতন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এই সরকার আমাদের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে কোনো মন্তব্য করছে না বা পারমাণবিক ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতাও করছে না। ওই দিক থেকে কোনো উসকানি নেই।’

অনির্বাণ গাঙ্গুলি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, তবে এবার নির্বাচনী দৌড়ে নেই। তবুও তিনি রাজ্যজুড়ে ছোট ছোট জনসভায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন একটি বই নিয়ে। বইটির তিনি সহলেখক। বইটিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য-সংক্রান্ত ভিশন তুলে ধরা হয়েছে। বইটির বাংলা সংস্করণের নাম ‘নরেন্দ্রনীতি: বাংলার প্রগতি’।

বিজেপির এই নেতা ব্যাখ্যা করেন, দেশভাগের স্মৃতির কারণে ভারতে বসবাসরত বাঙালি হিন্দুদের মনে বাংলাদেশের হিন্দুদের দুর্ভোগ সব সময়ই উপস্থিত থাকে। বিজেপি চেষ্টা করছে তাদের বোঝাতে যে যদি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের মুসলিম তোষণের রাজনীতি চলতে থাকে, তাহলে তাদেরও একই পরিণতি হবে। তিনি দাবি করেন, ‘আমাদের কাছে অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে হিন্দু ঐক্য এখন বড় ইস্যু। প্রধানমন্ত্রী (মোদি) প্রতিটি সমাবেশে এটি তুলছেন। আমাদের বাংলাদেশকে নাম নেওয়ার প্রয়োজন নেই।’

তবে দলের সবাই এই কৌশলে সন্তুষ্ট নন। ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সাবেক গভর্নর এবং দুই দশকেরও বেশি আগে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি তথাগত রায় নয়াদিল্লির এই অবস্থানে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি চাই বাংলাদেশি হিন্দুদের বিষয়টি আরও কিছুটা গুরুত্ব পাক।’ তাঁর মতে, ‘তারেক রহমানের আমলেও হিন্দু নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। হয়তো কেন্দ্রীয় সরকার নীরবে চাপ দিচ্ছে। কিন্তু আরও জোরালো অবস্থান নিলে আমি সন্তুষ্ট হতাম।’

৮২ বছর বয়সী তথাগত রায় এমন এক পরিবার থেকে এসেছেন, যার শিকড় বাংলাদেশে। তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের নিয়ে একটি বইও লিখেছেন। তাঁর মতে, দলের কৌশল পরিবর্তনের পেছনে বাঙালি সমাজের বর্ণভিত্তিক বিভাজন বড় কারণ। তাঁর ব্যাখ্যা, দেশভাগের পরের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসা শরণার্থীদের বড় অংশই ছিলেন উচ্চবর্ণের হিন্দু। তারা হোয়াইট কলার জব পেয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে চলে যান, যেখানে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা অনেকাংশে পেছনে রয়ে যান।

তথাগত রায় বলেন, ‘উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের বাঙালিরা একে অপরের থেকে এতটাই দূরে সরে গেছে যে তাদের মধ্যে সহানুভূতি খুবই কম। তাদের জীবিকার পথও আলাদা।’ তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে যে হিন্দুরা রয়ে গেছেন—তাদের বেশির ভাগই নিম্নবর্ণের এবং কৃষিকাজ বা ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এই বর্ণগত পরিচয়ের কারণে তাদের দুর্দশা নিজে থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বড় কোনো রাজনৈতিক সাড়া তোলে না। এমনকি যারা একসময় একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে শরণার্থী হয়েছিল, তাদের মধ্যেও নয়। ফলে এখন বিজেপি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে দুর্নীতি ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির মতো ইস্যুগুলোতে।

আরেক সাবেক আরএসএস নেতা শান্তনু সিনহার কাছে, এই অবস্থান মনে করিয়ে দেয়, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের মধ্যে একটি অভিন্ন পরিচয় ও চেতনা গড়ে তুলতে হিন্দুত্বের সাফল্য কতটা সীমিত ছিল। শান্তনু সিনহা হিন্দু সংহতির সভাপতি। এই গোষ্ঠীটি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) থেকে আলাদা হয়ে যায়। কারণ, তাদের কাছে সংগঠনটিকে অতিরিক্ত নরম মনে হয়েছিল।

শান্তনু দাবি করেন, গেরুয়া শিবির তথা বিজেপি যদি বাংলাদেশের হিন্দুদের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা চালিয়ে যেত, তাহলে এই কৌশল উল্টো ফল দিত। বিশেষ করে সীমান্ত থেকে দূরের সেই সব জেলায়, যেখানে শরণার্থী নেই। তাঁর মতে, তৃণমূল কংগ্রেস এখনো গড়পড়তা বাঙালির মানসিকতা, বিশেষ করে যারা শরণার্থী নয়, তাদের মনোভাব বিজেপির চেয়ে ভালো বোঝে।

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন মেদিনীপুরে (সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে) বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি, তখন তৃণমূল কর্মীরা ভোটারদের বলে যে আমরা নাকি তাদের এলাকায় শরণার্থীদের বসতি গড়তে চাই। বিষয়টা খুব জটিল। সব হিন্দুর মন পরিবর্তন করা খুব কঠিন।’

কট্টর হিন্দুত্ববাদী কর্মীরা এই চ্যালেঞ্জগুলো বুঝলেও, তৃণমূল স্তরের বিজেপি কর্মীরা হঠাৎ করে কেন দলটি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নীরব হয়ে গেছে, তা ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকার মধ্যবয়সী বিজেপি স্বেচ্ছাসেবক সুজিত জয়সওয়াল স্বীকার করেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তিনি সোজাসাপ্টা বলেন, ‘দুই দেশের সরকারের মধ্যে কী চলছে, সেটা শুধু নেতৃত্ব পর্যায়ের লোকজনই বলতে পারে।’

এই একই মনোভাব দেখা যায় মানিকতলায় দলের প্রার্থীর হয়ে কাজ করা ৭২ বছর বয়সী বিজেপি কর্মী সমর দের মধ্যেও। তবে সমর দে জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অবৈধ অনুপ্রবেশের বিষয়টি তোলা বন্ধ করেনি বিজেপি। তিনি বলেন, ‘মমতা (বন্দ্যোপাধ্যায়) বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সকে (বিএসএফ) জমি দিচ্ছেন না। তাঁর দলের লোকদের কাছ থেকে নকল আধার কার্ড আর ভোটার আইডি কার্ড ভর্তি ব্যাগসহ ধরা পড়েছে।’

বিজেপি যাকে ‘অনুপ্রবেশ’ বলছে, সেই ইস্যুকে জোর দিয়ে তুলে ধরলেই ভোটারদের সংগঠিত করা যাবে বলে আশা বিজেপি সমর্থকদের। কিন্তু এমনকি যেসব ভোটার বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ থেকে নথিহীন অভিবাসীদের প্রবেশের কারণে বাংলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে, তারাও এটিকে নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে দেখছেন না।

দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত লেক মার্কেট এলাকায় সবজি বিক্রেতা ৫৮ বছর বয়সী কার্তিক দাস আশপাশের হিন্দু পরিবারগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, প্রায় সব তরুণ বাসিন্দাই হয় অন্য রাজ্যে থাকেন, নয়তো দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে গেছেন। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। কারণ, তাদের সন্তান সংখ্যা বেশি এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি বাংলাদেশ থেকে এসেছে, এমনটাই তাঁর দাবি।

তবে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত কিসের ভিত্তিতে নেবেন—এই প্রশ্নে দাস নিজের পেটে হাত রেখে ইঙ্গিত দেন। তাঁর মতে, সীমান্ত সমস্যার কোনো সমাধান নেই। বরং জীবিকার মতো দৈনন্দিন বিষয়েই মনোযোগ দেওয়া ভালো। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না কেউ অনুপ্রবেশ থামাতে পারবে। এটা একটা আন্তর্জাতিক সমস্যা। আমি এটা নিয়ে চিন্তা করি না।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর নিজের সমস্যাই কম নয়। তাঁর ভাষায়, ‘অনলাইনে মানুষ সবজি অর্ডার করছে বলে আমার আয় কমে গেছে। অন্য কিছু নিয়ে ভাবার সময়ই নেই।’

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পর্যালোচনার আড়ালে ঢাকাকে কী বার্তা দিল দিল্লি

এশিয়ার মতো সংকটে পড়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান নাকি যুক্তরাষ্ট্র—কে আগে নতি স্বীকার করবে

ট্রাম্পকে বধিতে গোকুলে বাড়িছে তাঁরই ‘দানব’

ইউনূস সরকারের বাণিজ্য চুক্তি: কী অর্জনের জন্য এত বিসর্জন

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের প্রেম কি বিচ্ছেদের পথে

একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে সময়ক্ষেপণের কৌশল ট্রাম্পের, সফল হবেন কি

ইরান ও ইসরায়েলের উত্থানের মুখে দিশা পাচ্ছে না সৌদি আরব

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে অন্যতম বড় বাধা ট্রাম্পের বাগাড়ম্বর

বিশ্বশান্তি রক্ষায় ব্যস্ত ইসলামাবাদ: পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অন্দরে চলছে অন্য খেলা