চীন-নেপাল সীমান্তের তিব্বত ও উত্তর নেপাল অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ ধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শত শত মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার ও অনুসন্ধান অভিযান চলছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও বড় ধরনের হতাহতের কথা জানিয়েছে। নেপালের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা হবে ‘বিশাল’।
প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, একটি ভূমিকম্প থেকেই এই বিপর্যয়ের শুরু। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ভূমিধসের কিছুক্ষণ আগে তিব্বত-নেপাল সীমান্তে ভূমিকম্পের খবর পাওয়া গেছে। এতে ধারণা তৈরি হয় যে ভূমিকম্পটি হয়তো পাহাড়ধসের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসও বুধবার প্রথমে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। কিন্তু পরে আরও বিশ্লেষণের পর তারা সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। আজ বৃহস্পতিবার ইউএসজিএস জানায়, ঘটনাটি আসলে কোনো ভূমিকম্প ছিল না। বরং একটি হিমবাহ ধস এবং তার সঙ্গে তৈরি হওয়া বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির স্রোত বা ডেব্রিস ফ্লো থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। ইউএসজিএসের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে নিচের দিকে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।
হিমবাহ ধস এলাকার কাছাকাছি ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য, দীর্ঘ-তরঙ্গের ভূকম্পন সংকেত এবং স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে সেখানে কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। এর আগেই নেপালের কর্মকর্তারাও বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ বরফের একটি অংশ ধসে পড়ে থাকতে পারে। সেই বরফের সঙ্গে পাথর ও অন্যান্য মাটির উপাদানও নিচে নেমে এসে ভয়াবহ ধসের সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞানীরা এখন ঘটনাগুলোর সঠিক ক্রম বের করার চেষ্টা করছেন। তবে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়ার বিষয়টি এই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্কটল্যান্ডের ড্যান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি, পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিষয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এবং হিমবাহবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ সাইমন কুক বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে থাকতে পারে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও বরফ পাহাড়ের কিছু ঢালকে একসঙ্গে ধরে রাখে। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে গলে ও দুর্বল হয়ে যায়। ফলে পাহাড়ের ঢালে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে।
এ ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি অথবা গলে যাওয়া বরফ মাটি কিংবা বরফের কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়ে একটি শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া শুরু করে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখছেন ঠিক কোথায় ধস শুরু হয়েছিল, কোনো হিমবাহ-হ্রদ হঠাৎ খালি হয়ে গিয়েছিল কি না, নদীর কোথাও ধসের কারণে পানি আটকে গিয়েছিল কি না এবং সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় কতটা বৃষ্টিপাত হয়েছিল।
পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ উত্তর নেপালের বিভিন্ন এলাকার দিকে ছুটে যায়। এসব এলাকার মধ্যে পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় অনেক অঞ্চলও রয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সীমান্তবর্তী এই এলাকা প্রায় ৪০ মাইল বা ৬৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার উত্তরে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, কাদা ও পাথরের বিশাল স্রোত ভবন, রাস্তা ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষ দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসা সেই ধ্বংসস্তূপের স্রোত থেকে বাঁচতে পালাচ্ছে। নুয়াকোট অঞ্চলের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পানি ও কাদার বিশাল দেয়ালের মতো স্রোত ত্রিশূলী নদীর একটি গিরিখাত দিয়ে নেমে আসছে এবং বহুতল ভবন রসুয়াগাধি সীমান্ত চেকপোস্টকে প্রায় গ্রাস করে ফেলছে।
ভোতে কোশি, ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীতেও ভয়াবহ বন্যার খবর পাওয়া গেছে। তিব্বতের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেও প্রাণহানির খবর এসেছে।
আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র সতর্ক করেছে, আগামী কয়েক দিনে দ্বিতীয় দফা বন্যা হতে পারে। কারণ, পাহাড় থেকে ধসে পড়া বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নদীগুলোতে গিয়ে জমেছে। এতে নদীর সরু কোনো অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে থাকতে পারে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এখন পরীক্ষা করে দেখছে ত্রিশূলী নদীর কোনো সরু অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে কি না। যদি নদী এভাবে আটকে যায়, তাহলে সেখানে একটি ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ বা ভূমিধসজনিত প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হতে পারে। সেই বাঁধ ভেঙে গেলে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে এসে দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে।
কর্তৃপক্ষ ও বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য এসব বাধার আকার, অবস্থান এবং কতটা স্থিতিশীল, তা পরীক্ষা করে দেখছেন।
ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর শাখা ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার বা এনআরএসসি বিপর্যয়টির একটি প্রাথমিক স্যাটেলাইটভিত্তিক মূল্যায়ন করেছে। ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্যাটেলাইটের ছবি ব্যবহার করে সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ঘটনাগুলোর সম্ভাব্য ক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
ভারতের কক্ষপথে বর্তমানে ৫৬টি স্যাটেলাইট রয়েছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, দুর্যোগটির শুরু তিব্বতের উঁচু পাহাড়ে হয়ে থাকতে পারে। তাদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প সম্ভবত ‘সার্ক গ্লেসিয়ার’ বা বাটির মতো অববাহিকায় থাকা এক ধরনের হিমবাহের ধস ঘটিয়ে থাকতে পারে।
এই হিমবাহ ধস থেকে বিশাল বরফ-পাথরের তুষারধস বা ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ তৈরি হয়। সেটি খাড়া পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে নিচে নেমে আসে। এই বিশাল স্রোত সাময়িকভাবে একটি নদীর গতিপথ বন্ধ করে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে আটকে থাকা বিপুল পানি, কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যায়।
এরপর ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার ওপর দিয়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঢেউ বয়ে যায় এবং দ্রুত বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। স্যাটেলাইট ছবি নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক ধারণাও একই দিকে ইঙ্গিত করছে। অর্থাৎ একটি সার্ক গ্লেসিয়ারের ধস, এরপর বরফ-পাথরের বিশাল ধস এবং শেষ পর্যন্ত নদীতে আকস্মিক পানির স্রোতই এই বিপর্যয়ের সম্ভাব্য মূল কারণ।
ভারতের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করেছে। এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার এবং ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২২ মিনিটে ঘটনাটি রেকর্ড করা হয়। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি ভূমিকম্পটির অবস্থান নির্ধারণ করেছে ২৮.০৭৬ অক্ষাংশ এবং ৮৬.৪৯৪ দ্রাঘিমাংশে। এই অবস্থান রসুয়া অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়।
হিমালয় অঞ্চল স্বাভাবিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। তবে ইউএসজিএসের পরবর্তী বিশ্লেষণ বলছে, প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা ওই ‘ভূমিকম্প’ আসলে হিমবাহ ধস ও ডেব্রিস ফ্লোর সৃষ্টি করা ভূকম্পনজাত সংকেত ছিল এবং সেখানে প্রকৃত কোনো ভূমিকম্প ঘটেনি। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের বিশ্লেষণে এখনো কিছু পার্থক্য রয়েছে।
বিপর্যয়ের ব্যাপ্তি বুঝতে ভারতের হায়দরাবাদের এনআরএসসি একটি জিওস্পেশাল বা ভৌগোলিক তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন চালায়। বিজ্ঞানীরা দুর্যোগের আগের ও পরের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করেন। এর মধ্যে ইউরোপের সেন্টিনেল-২ স্যাটেলাইটে ২৪ আগস্ট তোলা ছবি ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে ইসরোর রিসোর্সস্যাট-২এ স্যাটেলাইটে ২৬ আগস্ট তোলা দুর্যোগ-পরবর্তী ছবি তুলনা করা হয়।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল রিসোর্সস্যাট-২ এর তোলা আরও পুরোনো একটি ছবি ব্যবহার করা হয়। পুরোনো ও নতুন ছবির তুলনার মাধ্যমে পাহাড়ি ভূখণ্ডে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে এবং কোন কোন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ছবির তুলনায় নদীর করিডরে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসাবশেষ জমেছে এবং বন্যার পানি ছড়িয়ে পড়েছে। এই ছবিগুলো বিজ্ঞানীদের বদলে যাওয়া ভূদৃশ্যের মানচিত্র তৈরি করতে এবং পাহাড়ি এলাকায় দুর্যোগটি কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা বুঝতে সাহায্য করেছে। মাটিতে পৌঁছানো যখন কঠিন বা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের দ্রুত স্যাটেলাইট মূল্যায়ন দুর্যোগ মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার একটি দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার চিত্র পায়।
পুরো তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সার্ক গ্লেসিয়ার। সার্ক গ্লেসিয়ার হলো পাহাড়ের পাশে বাটির মতো দেখতে একটি প্রাকৃতিক অববাহিকায় তৈরি হওয়া হিমবাহ। দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে তুষার ও বরফ জমতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ওপরের পাহাড়ি ঢাল থেকে তুষারধস নেমে এসে এই হিমবাহকে আরও বড় করে। ভূতাত্ত্বিক বা জলবায়ুগত কারণে এই ধরনের হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর একসঙ্গে পাহাড়ের নিচে নেমে আসতে পারে।
প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, তিব্বতে সম্ভবত ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছে। এরপর ঘটনাগুলো একটির পর একটি ঘটেছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন—হিমবাহ ধস → বরফ-পাথরের বিশাল ধস → নদীর সাময়িক প্রবাহ বন্ধ → পানি জমে জলাধার তৈরি → বাঁধ ভেঙে পানি ও ধ্বংসাবশেষের আকস্মিক মুক্তি → ভয়াবহ বন্যা।
এই ধারাবাহিক ঘটনাই একটি স্থানীয় পাহাড়ধসকে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ বন্যায় পরিণত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি ও এনডিটিভি