মজুরি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরও কাঙ্ক্ষিত কর্মী পাচ্ছে না ভিয়েতনামের অন্যতম দুটি প্রধান রপ্তানি খাত—তৈরি পোশাক ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান এই অর্থনৈতিক শক্তিতে এই বিপরীতমুখী চিত্র দেখা দিয়েছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির সরকার বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স বাড়াতে লাখ লাখ শ্রমিককে বিদেশে পাঠাতে উৎসাহিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভিয়েতনাম যখন তুলনামূলকভাবে কম দক্ষতার ম্যানুফ্যাকচারিং খাত থেকে বের হয়ে উচ্চমানের প্রযুক্তি ও হাই-টেক শিল্পে রূপান্তরের চেষ্টা করছে, তখন শ্রম অভিবাসনের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের ভেতরের শিল্পকাঠামোয় বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ভিয়েতনাম থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার কর্মী বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। গত বছরের শেষ নাগাদ বিদেশে অবস্থানরত ভিয়েতনামি কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখে। কেবল গত মে মাসেই প্রায় দুই হাজার কর্মী চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজে গিয়েছেন।
বিদেশে কর্মরত এই নাগরিকেরা প্রতিবছর ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠান, যা দেশটির মূল অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক এই কর্মীপ্রবাহের প্রভাবে ভিয়েতনামের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখন মারাত্মক সংকটে পড়েছে।
ভিয়েতনামের অ্যাসোসিয়েশন অব সি-ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড প্রডিউসারস (ভিএএসইপি) মেকং ডেলটা ও হো চি মিন সিটির মতো মূল উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে তীব্র শ্রমিক-সংকটের চিত্র তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বেতন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরও নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়া বা পুরোনো কর্মীদের ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
একই কথা জানিয়েছে দেশটির পোশাক খাতের সংগঠন ভিয়েতনামিজ টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশন (ভিআইটিএএস)। সংগঠনটির সভাপতি দো এনগোক তাই একটি শিল্প সম্মেলনে বলেন, অনেক কারখানা তাদের নির্ধারিত অর্ডারের সময়সীমা বজায় রাখতে বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারছে না। কারণ, তারা ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে লড়াই করে প্রয়োজনীয় কর্মী পাচ্ছে না।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রম অভিবাসন গবেষক হোয়াং ল্যান আন ব্যাখ্যা করে বলেন, পোশাকশিল্প বা মৎস্যশিল্পে কেবল বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের কারণেই সংকট হচ্ছে না, বরং দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস কারখানাগুলোতে উচ্চ বেতনের কারণেও কর্মীরা ওই দিকে ঝুঁকছেন।
ভিয়েতনামের দরিদ্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অধিবাসীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ভালো আয়ের সুযোগ নেই। গবেষক হোয়াং ল্যান আন বলেন, ভিয়েতনাম সরকার মূলত দারিদ্র্য দূরীকরণের হাতিয়ার হিসেবে শ্রমিক রপ্তানি নীতি ব্যবহার করে আসছে। মধ্য ভিয়েতনামে খাদ্যের অপ্রতুলতা ও কাজের সুযোগ কম থাকায় এখানকার মানুষ স্থানীয়ভাবে কাজ করার চেয়ে স্থানান্তরিত (দেশের ভেতরে বা বিদেশে) হতে পছন্দ করেন।
হোয়াং ল্যান আন জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ পোশাক ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাত খাতের কারখানায় কাজ করে কর্মীরা মাসে ২৫০ থেকে ৩৫০ মার্কিন ডলারের বেশি আয় করতে পারেন না, যা দিয়ে একটি পুরো পরিবারের মাসিক খরচ চালানো অসম্ভব। এর বিপরীতে, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে একজন ভিয়েতনামি শ্রমিক প্রতি মাসে এরচেয়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারেন। ফলে নিজের গ্রাম ছেড়ে দেশের অন্য প্রান্তে কাজ করতে যাওয়ার চেয়ে বিদেশে যাওয়াই তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
জাপান-ভিয়েতনাম ‘পারস্পরিক সহায়তা সমিতি’-র প্রতিনিধি পরিচালক জিহো ইয়োশিমিজু জানান, অনেক শ্রমিক উচ্চ আশা নিয়ে জাপানে যান, যাতে তাঁরা ঋণ পরিশোধ করতে পারেন এবং দেশে ফিরে এসে নিজস্ব ব্যবসা বা বাড়ি বানাতে পারেন। তবে বাস্তবতা সব সময় মসৃণ হয় না। ইয়োশিমিজু সতর্ক করে বলেন, কেবল বিদেশে মজুরি বেশি কি না—সেটিই মূল কথা নয়। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর উচ্চ ফি, যাতায়াত খরচ ও দালালের ঋণের কারণে অনেক কর্মী বিদেশে গিয়ে প্রথম কয়েক বছর মূল উপার্জনের বড় অংশই দেনা পরিশোধে হারিয়ে ফেলেন। এ ছাড়া সঠিক তথ্যের অভাব ও কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তাও তাঁদের ঝুঁকিতে ফেলে।
অন্যদিকে, অনেক দক্ষ তরুণ দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছেন। প্রযুক্তিবিদ ও দক্ষ কর্মীরা জানান, যদি নিজ দেশে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার উপযুক্ত মূল্যায়নসহ সম্মানজনক বেতন দেওয়া হয়, তবে তাঁরা প্রবাসজীবন ছেড়ে স্বদেশে ফিরতে ইচ্ছুক।
আগামী দিনের নীতিগত চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বিশ্লেষকেরা বলছেন, কেবল বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর ওপর জোর না দিয়ে ভিয়েতনাম সরকারের উচিত দেশের ভেতরের প্রথাগত উৎপাদন খাতগুলোর কর্মপরিবেশ ও কাঠামোতে পরিবর্তন আনা।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজ দেশের কর্মীদের অধিকার রক্ষা ও দেশের ভেতরের শিল্পে মজুরির সঠিক ভারসাম্য বজায় না রাখলে ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক রূপান্তরের এই স্বপ্ন অভ্যন্তরীণ শ্রমিক-সংকটে বারবার ধাক্কা খাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট