হোম > বিশ্লেষণ

তৃতীয় মহাযুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব, লক্ষণ স্পষ্ট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত বারুদের মতো হয়ে আছে। একটি মাত্র স্ফুলিঙ্গে হতে পারে বিস্ফোরণ। ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এক বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—আমরা কি শান্তির সময় পেরিয়ে যুদ্ধের যুগে প্রবেশ করছি? গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালেই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রিয়াদের বিমানবন্দরে মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইউক্রেনজুড়ে রাশিয়ার হামলায় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেও রাশিয়ার এমন হামলায় প্রাণহানির আশঙ্কা জানিয়ে সতর্ক করেছে পোল্যান্ড। অন্যদিকে নিজ উপকূলে ছয় দিনের আসল গোলাবারুদ দিয়ে সামরিক মহড়া শুরু করেছে চীন।

এসব ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা নিরাপত্তাহীনতারই প্রতিচ্ছবি। পশ্চিম ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলের মতো যেসব দেশ ও অঞ্চল দশকের পর দশক ধরে শান্তিকে চিরন্তন ধরে নিয়েছিল, তাদের আজ যুদ্ধের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সময়টা ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন শেষ হওয়ার ঠিক চার দিন পরই ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা চালায় রাশিয়া। সম্মেলনের শেষ দিনে আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একেবারে নিশ্চিত করে জানিয়েছিল, ভ্লাদিমির পুতিনের বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে কিয়েভ দখল করতে যাচ্ছে।

মিউনিখের এক হোটেলে রাতের খাবারের টেবিলে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার তৎকালীন প্রধান অ্যান্ড্রিউ শিয়ারার তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন। আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে রাশিয়ার আক্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় শিয়ারার তাঁকে বলেছিলেন, ‘একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা এমন বিষয়ে আলোচনা করছি, ভেবে অবাক লাগছে।’

তাঁর এই কথায় সেদিনের দ্বিধাদ্বন্দ্বই ফুটে উঠেছিল। একদিকে নিশ্চিত তথ্য ছিল যে রাশিয়া হামলা চালাতে যাচ্ছে, অন্যদিকে আধুনিক ইউরোপে এমন ঘটনা ঘটতে পারে—তা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল। সম্মেলনে আসা অনেক ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় প্রতিনিধি তো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এটা মানতেই চাননি। তাঁরা ভেবেছিলেন পুতিন কেবল হুমকি দিচ্ছেন বা গোয়েন্দা তথ্যে ভুল আছে। ইউরোপে শান্তি নষ্ট হওয়ার এই অবিশ্বাসের ঘটনা লিও ট্রটস্কির সেই বিখ্যাত উক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়, ‘আপনি হয়তো যুদ্ধে আগ্রহী নন, কিন্তু যুদ্ধ আপনার বিষয়ে ঠিকই আগ্রহী।’

পুতিনের সেই ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ শুরুর পর চার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে বৈশ্বিক রাজনীতির হাওয়া পুরোপুরি বদলে গেছে। আজকাল বিশ্বনেতাদের মুখে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার কথা শোনাই যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে এক আলোচিত উত্তপ্ত বাগ্‌বিতণ্ডায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন।’ ট্রাম্পের বিশ্বাস ছিল, ইউক্রেনকে পশ্চিমাদের সহায়তার কারণে আমেরিকা সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে জেলেনস্কিও বারবার বলেছেন—বিশ্ব এখন এক বড় সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে। তবে তাঁর মতে, আসল বিপদ লুকিয়ে আছে রুশ আগ্রাসন থামাতে ব্যর্থ হওয়ার মধ্যে। বিশ্বকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—পুতিনকে থামানো হবে, নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে দেওয়া হবে।

নিজের দেশের জন্য সমর্থন জোগাতে একজন যুদ্ধকালীন নেতার মুখে এমন আশঙ্কার কথা মানায়। তবে পশ্চিম ইউরোপের নেতারাও কিন্তু রাশিয়ার এই হুমকিকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। রাশিয়ার আক্রমণের পরপরই জার্মানি এক ঐতিহাসিক মোড়ঘোরার ঘোষণা দিয়ে প্রতিরক্ষায় শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ শুরু করে। নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপীয় নেতাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘রাশিয়ার পরবর্তী লক্ষ্য আমরাই...আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে ভয়াবহ যুদ্ধের মুখ দেখেছেন, আমাদেরও সেই প্রস্তুতি রাখতে হবে।’

বিশ্বযুদ্ধের এই আতঙ্ক কেবল ইউরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং প্রায়ই আমেরিকা ও চীনের ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপে’ পড়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেন। হার্ভার্ডের অধ্যাপক গ্রাহাম টিলেট অ্যালিসনের এই তত্ত্বের মূল কথা হলো—ইতিহাসজুড়ে দেখা গেছে, কোনো উদীয়মান শক্তি যখন বিদ্যমান পরাশক্তিকে টেক্কা দিতে যায়, তখন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেঁধে যায়।

তবে মজার বিষয় হলো, সি চিনপিং যেসব ঝুঁকির কথা বলে সতর্ক করছেন, তাঁর নিজের নীতিই সেই উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে চীন সামরিক খাতে পানির স্রোতের মতো টাকা ঢালছে। সাগরে এখন আমেরিকার চেয়েও বড় নৌবাহিনী তৈরি করে ফেলেছে চীন। সেই সঙ্গে তাইওয়ানের ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ ক্রমেই বাড়াচ্ছে বেইজিং; প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তাইওয়ান দখলের ঘোষণা দিয়ে রেখেছে তারা। জো বাইডেন তাঁর মেয়াদে চারবার স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, চীন হামলা চালালে আমেরিকা তাইওয়ানের পাশে দাঁড়াবে।

বিশ্বনেতারা কথায় কথায় ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দটা ব্যবহার করলেও, এর আসল অর্থ কী তা তারা স্পষ্ট করেন না। সহজ কথায়, একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ হতে গেলে দুটি মূল শর্ত পূরণ হতে হয়—প্রথমত, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে এবং দ্বিতীয়ত, সেই সংঘাতকে ছড়িয়ে পড়তে হবে একাধিক মহাদেশজুড়ে।

এখন পর্যন্ত এই দুটি শর্তের কোনোটিই ঘটেনি। তবে সেই ঝুঁকি কিন্তু উবে যায়নি। ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর রাশিয়া যেভাবে ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে—যার মধ্যে রয়েছে নাশকতা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা—তাতে যেকোনো মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝি থেকে বড় যুদ্ধ বেঁধে যেতে পারে। চ্যান্সেলর ফ্রেডেরিখ ম্যার্ৎজ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আমরা হয়তো সরাসরি যুদ্ধে নেই, তবে আমরা শান্তিতেও নেই।’

তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি শেষ পর্যন্ত একটি সত্যিকারের বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে? কিছু অংশগ্রহণকারী দেশের দৃষ্টিতে, এটি ইতিমধ্যে রূপ নিয়েছে। যখন উত্তর কোরিয়ার সৈন্যরা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়ানদের সহায়তা করার জন্য সম্মুখ সমরে এসে পৌঁছাল, তখন জেলেনস্কি এই ঘটনাকে ‘বিশ্বযুদ্ধের দিকে প্রথম পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধটিও ইউক্রেনীয় সংঘাতের সঙ্গে মিলে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে ইরান রাশিয়া থেকে সহায়তা পেয়েছে বলে ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়। এদিকে, ইউক্রেন উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন-প্রতিরোধীযুদ্ধে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার প্রস্তাব দিয়েছে।

রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পশ্চিমাদের একটি ‘শত্রু অক্ষের’ মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ক্রমশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ‘অক্ষ’ শব্দটি শুনে কিছু বিশ্লেষক কিছুটা সতর্ক হলেও, এই সম্পর্কগুলো যে স্পষ্ট এবং তা কোনো রাখঢাক না রেখেই প্রকাশ করা হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া ২০২৪ সালে পিয়ংইয়ংয়ে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পুতিনের পূর্ণ মাত্রায় ইউক্রেন আগ্রাসন শুরু হওয়ার ঠিক আগে, রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট চীন সফর করেছিলেন এবং দুই দেশ এক ‘সীমাহীন অংশীদারিত্বের’ ঘোষণা দিয়েছিল। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করে রাশিয়াকে টিকে থাকতে এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এই অক্ষের চারটি দেশই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি তাদের অসন্তোষের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ। রাশিয়া ন্যাটো সম্প্রসারণের তীব্র বিরোধী এবং এই জোটটিকে পিছিয়ে দিতে চায়। ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালিয়েছে। উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে হুমকি দিচ্ছে, যা সুরক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। চীন তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে—এবং প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হয়। ন্যাটোর মার্ক রুটে প্রায়ই এমন একটি ধারণার কথা আলোচনা করেছেন যে, চীন ও রাশিয়া একই সাথে এশিয়া ও ইউরোপে সমন্বিত সামরিক আক্রমণ চালাতে পারে।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাণহানির ক্রমাগত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের চরম সতর্কবার্তাগুলো উচ্চারিত হচ্ছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার বর্তমান যুদ্ধটি নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, আগ্রাসন শুরুর পর থেকে রাশিয়া প্রায় ১৫ লাখ সৈন্যের প্রাণহানি (নিহত বা আহত) দেখেছে। ইউক্রেনীয়দের হতাহতের সংখ্যা কম প্রচার করা হলেও তা লাখে গিয়ে ঠেকবে।

গাজার যুদ্ধে আনুমানিক ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন ইসরায়েলি আগ্রাসনে এবং ২ হাজার ইসরায়েলি মারা গেছেন (২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় নিহত ১ হাজার ২০০ জন ছাড়াও)। উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান যুদ্ধগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা ইরাক যুদ্ধের মতো আগের সংঘাতগুলোর তুলনায় কম। তবে এই লড়াই সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর শান্তি ও নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।

ইরান এবং ইউক্রেনের যুদ্ধগুলো বিশ্ব সংবাদের শিরোনাম দখল করে আছে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে ৬৫টি চলমান সংঘাতের হিসাব করেছে—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যা। বাইরে থেকে আসা শক্তির মদদে সুদানের সংঘাত বিশেষভাবে রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে—যেখানে সাধারণ মানুষের ওপর গণহত্যা এবং ১ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে।

তাহলে এই সংঘাত এবং রক্তপাতের জোয়ারের পেছনে মূল চালিকাশক্তি কী?

এর একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন, যা সংশোধনকামী শক্তিগুলোকে (revisionist powers) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বৈশ্বিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস জোগাচ্ছে। ১৯৮৯ সালে, অর্থাৎ বার্লিন প্রাচীর পতনের বছর, জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কানাডা এবং জাপান—বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় একই শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ২০২২ সালের মধ্যে, জি-৭ দেশগুলোর বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪৩ শতাংশ এবং বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক অংশে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমা জোটের ক্ষমতার আপেক্ষিক পতন এমন সব সংশোধনকামী শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, যারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অসন্তুষ্ট। আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের ফলাফলে সৃষ্ট মোহভঙ্গের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের বৃদ্ধিও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। পরবর্তী সময়ে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্টরা—ওবামাও বটে, ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে এবং বাইডেনও—এমন শান্তিদূত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যারা সমস্ত ‘চিরন্তন যুদ্ধের’ অবসান ঘটাবেন।

ক্ষমতার ভারসাম্যের এই পরিবর্তন রাশিয়া, ইরান এবং চীনকে আরও বেশি ঝুঁকি নিতে উৎসাহিত করেছিল। ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার সর্বাত্মক আগ্রাসন আকস্মিকভাবে ঘটেনি; এর আগে ২০০৮ সালে জর্জিয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়ান সামরিক আগ্রাসন, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়ায় অবৈধ দখল এবং ২০১৫ সালে সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেছিল। অন্যদিকে চীন দক্ষিণ সাগরের কৃত্রিম দ্বীপগুলোতে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে—এবং ফিলিপাইনের উপকূলের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত স্কারবরো শোল থেকে ফিলিপাইনকে হটিয়ে দিয়েছে।

নতুন প্রজন্মের কঠোর মনোভাবাপন্ন (strongman) নেতাদের উত্থান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাহীনতার এই নতুন পরিবেশকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। পুতিন, সি, ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মতো নেতারা হলেন একদল জাতীয়তাবাদী এবং নিজেদের নিয়তির নির্মাতা বলে দাবি করা ব্যক্তিত্ব। ইউক্রেনের পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের আগে পুতিন কার পরামর্শ নিচ্ছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ নাকি বলেছিলেন, ‘আইভান দ্য টেরিবল, পিটার দ্য গ্রেট এবং ক্যাথরিন দ্য গ্রেট।’

বিভিন্ন উপায়ে, এই সমস্ত শক্তিশালী নেতারা ‘জোর যার মুল্লুক তার’ ধারণাকে লুফে নিয়েছেন এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ধারণা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ট্রাম্পের উপ-চিফ অব স্টাফ স্টিভেন মিলার এই দৃষ্টিভঙ্গির এক শীতল সারসংক্ষেপ তুলে ধরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আপনি যত খুশি কথা বলতে পারেন। তবে আমরা এমন এক বিশ্বে বাস করি, বাস্তব বিশ্বে...যা শক্তি দ্বারা শাসিত, যা বলপ্রয়োগ দ্বারা শাসিত, যা ক্ষমতা দ্বারা শাসিত।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে প্রধান নিয়ম—অথবা মিলারের ভাষায় বলতে গেলে, একটা ‘ভদ্রতা’—হলো আগ্রাসন চালিয়ে জোরপূর্বক অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড দখল না করা। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করার পর এবং ২০২২ সালে পুতিন ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা শক্তিগুলো এই নীতিকে সামনে রেখে একজোট হয়েছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসন নিজেই এখন এলাকা দখলের চিন্তাভাবনা শুরু করেছে—এমনকি নিজেদের মিত্রদের জায়গা নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে নেই। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিজের দাবি তুলে বসেন, যা মূলত ডেনমার্কের অধীনে থাকা একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। বিষয়টি ডেনমার্ক এতটাই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল যে, সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঠেকানোর জন্য তারা দ্বীপটির প্রধান রানওয়েগুলোতে মাইন পুঁতে রেখেছিল।

কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১ তম অঙ্গরাজ্য বানানোর জন্য ট্রাম্পের বারংবার এই ইচ্ছাকে অনেকেই কেবল ট্রল বা রসিকতা ভেবে উড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু কানাডার সরকার ও জনগণ বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়নি। তারা এই হুমকির জবাবে নিজেদের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতি নতুন করে সাজিয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি সেদিকে গড়ালে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিকল্পনাও যে তারা তৈরি করে রেখেছে, সে কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের বড় বড় পরাশক্তিগুলোর এভাবে অন্যের ভূখণ্ড দখলের ভাবনা এবং ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতির ওপর এই আনন্দ প্রকাশ—স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে ট্রাম্পের নানা ঘোষণা এবং পুতিন ও সি চিনপিংয়ের রাজ্য বিস্তারের ইচ্ছার পেছনে শান্তির একটা নিজস্ব তত্ত্ব রয়েছে। তত্ত্বটি হলো—বড় পরাশক্তিগুলোকে তাদের আশেপাশের অঞ্চলে নিজেদের একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে দিতে হবে। আর তাদের ছোট প্রতিবেশী দেশগুলোকে—যেমন ইউক্রেন, তাইওয়ান, কানাডা কিংবা কিউবা—সেই আঞ্চলিক পরাশক্তির আধিপত্য মেনে নিয়ে চলতে হবে। তাছাড়া, সব বড় শক্তি যদি একে অপরের এই প্রভাববলয়কে মেনে চলে ও সম্মান করে, তবেই বিশ্বে শান্তি বজায় থাকবে।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী—কোনো কাল্পনিক নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার চেয়ে এই ধরনের নিষ্ঠুর বাস্তব রাজনীতিই নাকি বিশ্বশান্তির সবচেয়ে বড় জামিনদার। শুনতে হয়তো কথাটি ওপর ওপর কিছুটা যুক্তিযুক্ত মনে হতে পারে, কিন্তু একটু গভীরভাবে বিচার করলেই এর আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে। কারণ, এই নীতি প্রতিবেশী দেশগুলোর মতামত আর স্বার্থকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। কানাডাকে কেন ট্রাম্পের ইচ্ছার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হবে? কিংবা গণতান্ত্রিক তাইওয়ান কেন চীনের একদলীয় শাসনের অধীনতা মেনে নিতে বাধ্য থাকবে? ইউক্রেনে রাশিয়া যা হাড়েনাতে টের পেয়েছে—ছোট দেশগুলোরও নিজস্ব অধিকার ও স্বকীয়তা আছে এবং তারাও পাল্টা লড়াই করার ক্ষমতা রাখে।

এমনকি তথাকথিত ‘পরাশক্তির’ স্বার্থের কথা হিসাব করলেও, বিশ্বকে বিভিন্ন প্রভাববলয়ে ভাগ করে দিয়ে কখনোই শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাইওয়ান বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ উন্নত সেমিকন্ডাক্টর তৈরি করে, তাই একে চীনের পেটে চলে যেতে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই দেবে না। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নও পোল্যন্ড বা রোমানিয়ার মতো নিজেদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আবারও মস্কোর অধীনে চলে যেতে মেনে নেবে না।

প্রভাববলয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা ট্রাম্প-পুতিনের এই বিশ্বব্যবস্থা যদি কাজ না করে, তবে শান্তি রক্ষার জন্য অন্য পথ খুঁজতে হবে। ১৯৪৭ সালের শেষভাগ এবং ন্যাটো প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সামরিক প্রতিরোধের নীতির ওপর ভরসা করে আসছে। মূল ধারণাটি ছিল—সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে নিজের ভূখণ্ড বাড়াতে চাইলে প্রতিটি দেশকে মনে রাখতে হবে যে, তাদের একজোট ও জোরালো জবাবের মুখে পড়তে হবে।

মোটের ওপর পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়কে কাজে লাগিয়ে এই প্রতিরোধ নীতি এতদিন কাজও করেছে। ১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের মতো কিছু উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সত্ত্বেও পুরো স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকে দেওয়া নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা উচিত—ট্রাম্প স্পষ্টতই এই চিন্তার প্রতি বেশ আকৃষ্ট। বিভিন্ন সময়ে তিনি আমেরিকার মিত্রদের পরজীবী ও কাপুরুষ বলে গালমন্দও করেছেন।

এখন পরিস্থিতি যদি সত্যিই তেমন দাঁড়ায়, ট্রাম্পের আমেরিকা কি বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো, পোলাণ্ড, জাপান কিংবা ব্রিটেনকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর কারও জানা নেই।

ইতিহাস আমাদের বলে—বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের সংকটগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মিত্রদের নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিগুলো নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছিল। ১৯১৪ সালে ব্রিটেন বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জার্মানির ধারণা ছিল, ১৮৩৯ সালে সই হওয়া একটা ‘কাগজের টুকরো’র জন্য ব্রিটেন যুদ্ধে জড়াবে না। জার্মানির সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। একইভাবে ১৯৩৯ সালে নাৎসিদের ঠেকাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স পোলাণ্ডকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু এর আগের সংকটগুলোতে ব্রিটিশ ও ফরাসি নেতাদের অবস্থান দেখে হিটলার ধরে নিয়েছিলেন যে তারা এবারও পিছিয়ে যাবে। হিটলারের সেই ধারণাও ভুল ছিল।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সি চিনপিংকেও হিসাব করতে হচ্ছে যে, তাইওয়ান প্রণালী বা দ্বীপে কোনো শক্তির ব্যবহার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি (তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট) রয়েছে, তার আদৌ কোনো মূল্য আছে কি না। একইভাবে পুতিনকেও হিসাব করতে হচ্ছে ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারা নিয়ে—যেখানে এক সদস্যের ওপর হামলাকে ৩২টি দেশের ওপর হামলা হিসেবে ধরে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এটা কি এখনও আগের মতো শক্ত প্রতিশ্রুতি, নাকি শুধুই আরেকটা ‘কাগজের টুকরো?’

আজকের দুনিয়ায় এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বশান্তি টিকবে কি না।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

কলকাতায় পদদলিত হয়ে ১৯ প্রাণহানি: এ ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটে, প্রতিরোধের উপায় কী

দিল্লি যাবেন না, মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও, ভারতকে কী বার্তা দিল যুক্তরাষ্ট্র

হুয়াওয়ে যেভাবে চীনের সফট পাওয়ারের হাতিয়ার হয়ে উঠল

বাংলাদেশের মতো সরকার পতনে বিজেপি কেন সতর্ক করছে

ইয়েমেনের তাইজ দখলের লড়াই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও কেন হুতিদের সামনে নাকাল সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র কেন দূরে

৯৬% মুসলিমের দেশ আজারবাইজানে কেন বিদ্যালয়ে হিজাবে নিষেধাজ্ঞা

নেহা বোরার সংগঠন আইসা কী, তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যইবা কী

গাজায় আগ্রাসন যেভাবে মোদির ভারতকে ইসরায়েলঘনিষ্ঠ করে তুলল

ইসরায়েলি দখল-গণহত্যার বিপরীতে মৌলিক প্রশ্ন—গাজা শাসন করবে কে