হোম > বিশ্লেষণ

সেনাবাহিনী নেই, তবু যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে একটি দেশ—কেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

৪ লাখ মানুষের এই দ্বীপরাষ্ট্র নিজের সুরক্ষার জন্য জোট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৯৫১ সালের একটি দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর নির্ভর করে আসছে। ছবি: সংগৃহীত

আইসল্যান্ডের কেফলাভিক বিমানঘাঁটির আকাশে গর্জন তুলে উড়ে যাচ্ছে বেলজিয়ামের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। বিশাল হ্যাঙ্গারের ভেতরে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পি-৮এ পোসেইডন’ সাবমেরিনবিরোধী বিমান। আর সমুদ্রে টহল দিচ্ছে কানাডীয় যুদ্ধজাহাজ এইচএমসিএস ‘ভিল দ্য কেবেক’।

তবে এই সামরিক মহড়ায় একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো—সেখানে কোনো আইসল্যান্ডিক সেনাসদস্য নেই।

প্রায় চার লাখ জনসংখ্যার দ্বীপরাষ্ট্র আইসল্যান্ড ন্যাটোর একমাত্র সদস্য, যার নিজস্ব স্থায়ী সামরিক বাহিনী নেই। কয়েক দশক ধরে দেশটি নিরাপত্তার জন্য ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৯৫১ সালের দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর নির্ভর করে আসছে।

কিন্তু উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এখন আইসল্যান্ডকে এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, যা দেশটি দীর্ঘদিন এড়িয়ে গেছে। প্রশ্নটি হলো—নিজের প্রতিরক্ষায় আইসল্যান্ডের ভূমিকা আসলে কী হওয়া উচিত?

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নর্দার্ন ভাইকিং সামরিক মহড়ায় ন্যাটো মিত্ররা আইসল্যান্ডের চারপাশের সমুদ্রপথ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার অনুশীলন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দুই বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই মহড়ায় সাবমেরিনবিরোধী যুদ্ধ এবং সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

ন্যাটোর ইউরোপীয় বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল অ্যালেক্সাস জি গ্রিনকেভিচ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উত্তর আটলান্টিকের নতুন হুমকির কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, রাশিয়া ও চীনের তথাকথিত গবেষণা জাহাজগুলো এখন যৌথভাবে এই অঞ্চলে টহল দিচ্ছে। এসব জাহাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

আইসল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থরগেরদুর ক্যাট্রিন গুনারসদোত্তিরও বলেছেন, রাশিয়া এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং চীনও উত্তরাঞ্চলীয় অঞ্চলের প্রতি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে ন্যাটোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।

আইসল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব নতুন নয়। দেশটি গ্রিনল্যান্ড-আইসল্যান্ড-যুক্তরাজ্য বা ‘জিআইইউকে গ্যাপ’ নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। এই পথ দিয়েই উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চল থেকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার জলসীমায় যাতায়াত করা যায়।

রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় নৌবহরের জন্য এটি উত্তর আটলান্টিকে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। অন্যদিকে, বড় কোনো সংঘাত শুরু হলে ন্যাটোর সেনা, রসদ ও সহায়তা ইউরোপে পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও এই করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম।

এই কারণেই কেফলাভিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পি-৮এ পোসেইডন বিমান মোতায়েন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাবমেরিন শনাক্ত ও অনুসরণে ব্যবহৃত এই বিমান টর্পেডো, হারপুন জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রে নিক্ষেপযোগ্য বিশেষ সেন্সর বহন করতে পারে।

একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে ন্যাটো। ১২ ফুট দীর্ঘ যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর চালকবিহীন সারফেস ভেসেল ‘লাইটফিশ’ সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে ক্যামেরা, ইনফ্রারেড সেন্সর ও রাডারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

আইসল্যান্ডের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ সমুদ্রের তলদেশ। দেশটির সঙ্গে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার যোগাযোগ রক্ষাকারী চারটি ট্রান্স-আটলান্টিক কেবল রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নাশকতা ও ‘হাইব্রিড হামলা’র আশঙ্কা বাড়ায় এসব কেবলও নিরাপত্তা ঝুঁকির অংশ হয়ে উঠেছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় গত ফেব্রুয়ারিতে আইসল্যান্ড প্রথমবারের মতো একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তানীতি গ্রহণ করেছে। এতে ন্যাটো সদস্যপদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিকেই দেশের নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

তবে আইসল্যান্ড শুধু মিত্রদের ওপর নির্ভর করেই বসে নেই। দেশটির বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমশ সামরিক ধরনের দায়িত্ব পালন করছে। আইসল্যান্ডিক কোস্ট গার্ডের প্রায় ২৮০ কর্মকর্তা রয়েছে এবং তারা দুটি অফশোর টহলজাহাজ পরিচালনা করে। পাশাপাশি চারটি রাডার কমপ্লেক্সের মাধ্যমে দেশটির আকাশসীমাও পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি।

কেফলাভিক ঘাঁটির উপ-কমান্ডার মারভিন ইঙ্গোলফসন বলেন, আইসল্যান্ডে স্থায়ী সেনা কর্মকর্তা না থাকলেও পুলিশ, কোস্ট গার্ড এবং বিভিন্ন বেসামরিক প্রতিষ্ঠান এমন অনেক কাজ করছে, যা সাধারণত সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে সবার কাছে এই ব্যবস্থা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। ‘গার্ডিয়ানস অব আইসল্যান্ড’ নামে একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান আন্দোলন দেশটির নিজস্ব প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠনের দাবি তুলেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আইসল্যান্ডে দুই হাজার সদস্যের একটি স্থায়ী বাহিনী, আরও দুই হাজার সদস্যের রিজার্ভ এবং যুদ্ধকালীন ৪০ হাজার সদস্যের মোবিলাইজেশন ফোর্স গঠন করা যেতে পারে। তাদের যুক্তি, ন্যাটোর সহায়তা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত এই বাহিনী অন্তত প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।

তবে আইসল্যান্ডে নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠনের ধারণাটি এখনো জনপ্রিয় নয়। অনেকের কাছে এটি প্রায় নিষিদ্ধ আলোচনার বিষয়। সরকারও আপাতত সেনাবাহিনী গঠনের পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়।

আইসল্যান্ডের প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান জোনাস জি অ্যালানসনের মতে, সেনাবাহিনী গঠনের পরিবর্তে বেসামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সামরিক প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয় ফল অর্জন করাই দেশটির লক্ষ্য।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও আইসল্যান্ডের নিরাপত্তা বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আগামী ২৯ আগস্ট ইইউতে যোগদানের আলোচনা পুনরায় শুরু করা হবে কি না, সেই বিষয়ে দেশটিতে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। সমর্থকদের মতে, ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আইসল্যান্ডের জন্য নিরাপত্তার আরও একটি স্তর তৈরি করতে পারে।

তবে আপাতত আইসল্যান্ডের বাস্তবতা অপরিবর্তিত—নিজেদের কোনো সেনাবাহিনী নেই, কিন্তু চারপাশের সমুদ্র ও আকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি ক্রমেই দৃশ্যমান। রুশ সাবমেরিন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এবং আর্কটিক অঞ্চলের নতুন প্রতিযোগিতার মধ্যে দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন তার পুরোনো শান্তিবাদী অবস্থান এবং নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।