দ্য ওয়্যারের নিবন্ধ
২৫ বছর ধরে ক্ষমতার ঘোড়ায় চড়ে আছেন নরেন্দ্র মোদি। প্রথমে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে, পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তাই এখন তাঁর ক্ষমতার শীর্ষে থাকার দিন যে শেষের দিকে চলে এসেছে, সেটি বিশ্বাস করাও হয়তো তাঁর জন্য কঠিন। কিন্তু পুলওয়ামার মতো আরেকটি ঘটনা বা অন্য কোনো ‘অলৌকিক’ ঘটনা না ঘটলে ২০২৯ সালের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আবার ক্ষমতায় ফিরবে, এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
এমনকি আগামী তিন বছরে—পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আগে—মোদির প্রচারযন্ত্র যত ধরনের কৌশলই গ্রহণ করুক না কেন, তাতেও পরিস্থিতি বদলানোর সম্ভাবনা কম। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও সীমিত করা, বিরোধী দলগুলোকে ভেঙে দেওয়া, সরকারি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানো এবং আরও বেশি ভোটারকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, এসব চেষ্টা হতে পারে। বিহারে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ ভোটারকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।
বিজেপির বিরুদ্ধে এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রধান কারণ হলো—মোদি সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ ধীরে ধীরে বাড়ছে। মোদির নজিরবিহীন প্রচারযন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে এমন এক ‘জাতির পিতা’ হিসেবে তুলে ধরেছে, যিনি শুধু দেশের মানুষের কল্যাণ নিয়েই চিন্তা করেন। কিন্তু সেই ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের ফাটল ধরতে শুরু করেছিল। এ বছরের নীট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আবারও ফাঁস হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের সাত সপ্তাহের আন্দোলন এবং ২০ জুলাই দিল্লি পুলিশের জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের আগেই সেই ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কারণ বোঝা কঠিন নয়। প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী নীট পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতের ৮২৩টি মেডিকেল কলেজে থাকা ১ লাখ ৩৭ হাজার আসনের কোনো একটিতে ভর্তি হওয়া। পাশাপাশি ভেটেরিনারি ও আয়ুর্বেদিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছিল আরও ৮০ হাজার আসন। এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ওপরই তাদের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছিল। কিন্তু পরীক্ষা শেষ করার পর তারা জানতে পারে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে গেছে এবং তাদের আবার পরীক্ষা দিতে হবে।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি ধরা পড়ে। পরবর্তী কয়েক দিনে বিভিন্ন স্কুল ও কোচিং প্রতিষ্ঠান থেকে একের পর এক অভিযোগ আসায় বিষয়টি নিশ্চিত হয়। সরকার ৫ দিন ধরে ব্যাপক তদন্ত চালানোর পর ২১ জুন নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করে। এই পরিস্থিতির মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে অন্তত ১২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।
এ বছরের নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং শিক্ষিত তরুণদের চাকরি পাওয়ার মরিয়া চেষ্টা যত বেড়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ‘দাম’ও তত বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও ঘন ঘন ঘটছে। ফলে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র বিক্রি করা এখন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রিবিউন জানিয়েছে, আট বছরে ৯০ টিরও বেশি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। কংগ্রেস আরও বড় একটি পরিসরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়ে যে হিসাব করেছে, তাতে কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র বলেছেন, ১০ বছরে এই সংখ্যা ১৫২ টি। আর এসব ঘটনা ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য মরিয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
এই হতাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার সংখ্যাতেও। প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৪ সালে যেখানে ৮ হাজার ৬৮ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল, ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৪৮৮, অর্থাৎ প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি। আত্মহত্যার সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ ছিল প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া এবং পারিবারিক চাপ বা উত্তেজনা। তবে দ্বিতীয় প্রধান কারণ ছিল এই জীবন-মরণ পরীক্ষাগুলোতে উত্তীর্ণ হতে না পারা। ক্যারিয়ার ৩৬০ নামের একটি অলাভজনক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ হাজার ৭১টি আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ‘পরীক্ষায় ব্যর্থতা’কে ‘আত্মহত্যার প্রধান কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির একটা বিস্ফোরণ ঘটারই কথা ছিল। চলতি বছরের জুনে সেটিই ঘটে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি নামের একটি সংগঠনের আবির্ভাবের ফলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ নেয়। আন্দোলনের মূল দাবি হয়ে ওঠে জবাবদিহি। আর সেই জবাবদিহির প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে তারা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে। মোদি চাইলে সহজেই এই দাবি মেনে নিতে পারতেন। তাঁর অন্যতম ‘দক্ষ ও সম্মানিত মন্ত্রী’ ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কয়েক মাস পর অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও দিতে পারতেন। কিন্তু সিজেপি যখন দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দেয়, তখন বিষয়টি রাজনৈতিক হুমকিতে পরিণত হয়। আর লাদাখের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় নেতা সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর সেই হুমকি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
এর জবাবে মোদি গত ১৩ বছরে তাঁর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে আসা প্রায় প্রতিটি চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, এবারও সেভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান। প্রথমে ছিল উচ্চমন্য অবজ্ঞা, এরপর নির্মম দমন-পীড়ন। সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউনিফর্ম পরা পুলিশ এবং সাধারণ পোশাকে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর বল প্রয়োগ করছে। ব্যাপকভাবে দেখা এক ভিডিওতে এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে এক নারী বিক্ষোভকারীকে চড় মারতে দেখা যায়। আরেক ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা একটি মেয়েকে ঘিরে রেখেছে এবং অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে যৌন হেনস্তা করা হয়েছে। এ সময় পাশে থাকা অন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্যরা হাসছিল। আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা পেছন থেকে একটি মেয়েকে খোঁচা দিচ্ছেন বলেও ভিডিওতে দেখা যায়।
ভিডিওগুলোতে আরও দেখা যায়, র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) বিক্ষোভকারী জনতার ওপর পেলেট গান ব্যবহার করছে। এতে কয়েকজনের মুখ ও চোখে আঘাত লাগে। মাত্র ২৫ বছর বয়সী শেখ ইরশাদ মনসুরির মুখে বেশ কয়েকটি আঘাত লাগে। আরও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৯ বছর বয়সী সাহিল লোচাবের ক্ষেত্রে। তাঁর ডান চোখের মণিতে পেলেটের আঘাত লাগে এবং সম্ভবত সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি তিনি স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে, বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীরে। কিন্তু এবার ঘটনাটি ঘটছিল দেশের রাজধানী দিল্লির একেবারে কেন্দ্রস্থলে। ফলে ভারতের প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ঘটনার খবর সম্প্রচার করেছে। কোটি কোটি টেলিভিশন সেটে এসব দৃশ্য পৌঁছে গেছে এবং লাখ লাখ মানুষ তা দেখেছেন। আরও লাখ লাখ মানুষ নিজেদের মোবাইল ফোনেও সংঘর্ষ ও দমন-পীড়নের বিভিন্ন অংশের ভিডিও দেখেছেন।
বিজেপির সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে পরাজয়ের ব্যাপকতা এতটাই বিশাল যে, বিষয়টি এখন দলটির জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে এই পরাজয় ঘটেছে বিহারের এমন এক বিধানসভা আসনে, যেটি গত বছর বিজেপির বর্তমান সভাপতি নীতিন নবীন জিতেছিলেন এবং গত ৩৫ বছর ধরে বিজেপি বড় ব্যবধানে ধরে রেখেছিল। এর অর্থ হলো, গেরুয়া দলের সবচেয়ে শক্ত সমর্থকরাও এখন দলটিকে সমর্থন করা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে শুরু করেছেন।
সরকার অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। কিন্তু পাল্টা কৌশল তৈরি করতে তাদের পুরো সাত দিন লেগে যায়। সেই কৌশলের মূল বিষয় ছিল, গত ১৩ বছর ধরে দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা নরেন্দ্র মোদির পরিচিত সেই অভিভাবকসুলভ, সবার ভুল ক্ষমা করে দেওয়া ‘বাবার মতো’ ভাবমূর্তিকে আরও জোরালোভাবে সামনে আনা।
২৯ জুলাই স্থানীয় পর্যায়ের এক জুনিয়র আইনজীবী স্মৃতি সিং চন্দেল দাবি করেন, তিনি ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে শনাক্ত করেছেন। ওই কিশোরী জন্তর মন্তরের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া উচ্ছ্বসিত তরুণদের একজন ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির অভিযোগ ছিল, সে মোদিকে নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় কথা বলেছিল এবং মোদির মাকে গালিগালাজ করেছিল। পরে চন্দেল অভিযোগটি প্রত্যাহার করে নেন।
কিশোরী আসলে কী বলেছিল, সেটিই মোদির ভাবমূর্তি নির্মাতাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে ওঠে। পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে একটি জিরো এফআইআর দায়ের করে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই পুলিশ জোর দিয়ে বলতে থাকে যে মেয়েটির বয়স ২৫ বছর। মেয়েটির মানসিকভাবে যথেষ্ট ভেঙে পড়ার পর তাকে বলা হয়, দেশের মহান ‘পিতা’ নরেন্দ্র মোদি তাকে ক্ষমা করতে চান, যদি সে মোদির কাছে ক্ষমা চায়।
কিশোরী তাতে রাজি হয় এবং একটি ভিডিও প্রকাশ করে ক্ষমা চায়। ভিডিওতে সে বলে, ‘আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। আমি যা করেছি, তা ক্ষমার অযোগ্য। আমি খুবই অশ্লীল কিছু বলেছিলাম। কিন্তু এটাই আমার প্রথম এবং শেষ ভুল। আমি আর কখনো এমন করব না। আমি ওই ভিডিওটি পোস্ট করিনি। আমি পুরো দেশের কাছে ক্ষমা চাইতে চাই। আমি লজ্জায় মাথা তুলতেও পারছি না। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করুন। দয়া করে।’
মোদি জানান, তিনি তাকে ‘ক্ষমা’ করে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে করা জিরো এফআইআর আরও কয়েক দিন তদন্তাধীন ছিল। শেষ পর্যন্ত চন্দেল অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেন। তবে তাঁর আগে ওই কিশোরীকে আইনের চোখে এক ‘ওয়ান্টেড’ ব্যক্তি হয়ে থাকার যে মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে, তা তাকে পোহাতে হয়।
এরপর থেকে মোদি আবার ইনস্টাগ্রাম এবং এক্সে নিজের সেই স্নেহশীল, অভিভাবকসুলভ চেহারা তুলে ধরতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, জন্তর মন্তরের বিক্ষোভ আসলে শিক্ষিত তরুণদের ভয় ও উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে, এমন চাকরি পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে বাবা-মা তাদের জন্য যে ত্যাগ করেছেন, সেই ত্যাগের মূল্য দিতে পারবে কি না, সেটিও তাদের দুশ্চিন্তার বিষয়। মোদির বক্তব্য অনুযায়ী, এসব তরুণকে শাস্তি দেওয়া নয়, তাদের ক্ষমা করা প্রয়োজন।
কিন্তু বিহারের বাঁকিপুরে বিজেপির চমকপ্রদ পরাজয় এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ায় দলটির তুলনামূলক কম নাটকীয় উপনির্বাচনী পরাজয় ভিন্ন এক বার্তা দিচ্ছে। বাঁকিপুরে নতুন মুখ প্রশান্ত কিশোর বিজেপিকে হারিয়েছেন। এই ফল থেকে এখনই কোনো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়তো খুব চটজলদি হবে, কারণ একটি দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন বা একটি-দুটি উপনির্বাচন দিয়ে ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না। কিন্তু যথেষ্ট কারণ আছে মনে করার যে, ভারতের তরুণরা মোদির ‘ভালো দিন’ আসার প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছে।
বিশেষ করে ২০১৩-১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। বিজেপি তখন বলেছিল, ক্ষমতায় এলে তারা ২ কোটি বা ২০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। ধারণাটি ছিল, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে এই কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। এই প্রতিশ্রুতির কারণে বিজেপির ভোটারদের মধ্যে তরুণদের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০০৯ সালে বিজেপির ভোটারদের মধ্যে তরুণদের অংশ ছিল ২০ শতাংশ। ২০১৪ সালে তা বেড়ে হয় ৩৪ শতাংশ, আর ২০১৯ সালে আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ শতাংশে।
মোদি সরকার এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার পরও তরুণ ভোটারদের সমর্থন প্রায় সেই উচ্চ পর্যায়েই ছিল। ২০২৪ সালের হিসাবে এটি ছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ। এখন বিজেপি সবচেয়ে বেশি যে ভোটারদের হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, তারাই এই তরুণ ভোটার।
সিজেপির উত্থান কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং জন্তর মন্তরে তরুণদের ওপর হামলার পর বিজেপি কোন দিকে যাচ্ছে, সেটির জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। মোদির কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়াই যেন তরুণদের শেষ চাওয়া! বরং মোদির হঠাৎ করে নিজেকে একজন সদয় ও ক্ষমাশীল নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেই মনে হয়। তরুণদের প্রয়োজন চাকরি। এমন নিরাপদ ও স্থায়ী চাকরি, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারে। কিন্তু গত ১২ বছরে মোদি সরকার এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেনি যে তারা কীভাবে এই কর্মসংস্থান তৈরি করবে, তা জানে।
ভারতীয় জনতা পার্টিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইলে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সকে’ একটি বিশ্বাসযোগ্য কর্মসংস্থান পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এমন পরিকল্পনা দরকার, যা তরুণদের মধ্যে ক্রমেই বাড়তে থাকা সেই গভীর উদ্বেগ দূর করতে পারে। এই উদ্বেগের কারণে আরও বেশি সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ শিক্ষার্থী হতাশ হয়ে পড়ছে, এমনকি আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছে।
শুধু পরিকল্পনা তৈরি করলেই হবে না। ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সকে এখনই সেই পরিকল্পনা তারা যেসব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, সেখানে বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। এই কাজ করার জন্য তাদের হাতে প্রায় তিন বছর সময় আছে। কিন্তু তিন বছর আসলে খুব বেশি সময় নয়।
লেখক: প্রেম শঙ্কর ঝা, অর্থনীতিবিদ, লেখক ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর। তিনি আগে হিন্দুস্তান টাইমস এবং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী ভিপি সিংয়ের তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
দ্য ওয়্যার থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান